বন্ধুর শিক্ষিকা স্ত্রীও একই সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন। তাঁর সামনে আমার এ-জাতীয় কথায় বন্ধুটির সম্মান বোধহয় সামান্য ঘা খেয়েছিল। তাইতেই যথেষ্ট উত্তাপ ছড়িয়ে হঠাৎই ঝাঁঝিয়ে উঠলেন বন্ধুটি, “দেখো, সিরিয়াসলি তোমার সঙ্গে আলোচনা করতে চেয়েছিলাম, চ্যাংড়ামি নয়।”
কেউ রেগে গেলে তাকে আরো রাগিয়ে দেবার একটা প্রবণতা মাঝে মধ্যে আমাকে পেয়ে বসে। আর ওই বিদ্যুটে প্রবণতাটাই আমাকে তখন পেয়ে বসেছিল। তবু অনেক করে সংযত করতে হলো নিজেকে, বন্ধু-পত্নীর উপস্থিতির কথা মাথায় রেখে। তাই আলোচনায় জের টানতে শুধু বললাম, “জ্যোতিষশাস্ত্র এমন কোনও তত্ত্ব বা তথ্য হাজির করে প্রমাণ করতে পারেনি মানুষের ভাগ্য পূর্ব-নির্ধারিত এবং ভাগ্যকে নিয়ন্ত্রণ করছে আকাশের গ্রহ-নক্ষত্র। তাই জ্যোতিষশাস্ত্রের এই কথাগুলোকে মেনে নিতে আমাদের ঘোরতর আপত্তি আছে।”
অধ্যাপক বন্ধুটির মতো এমন প্রশ্ন অনেক বিদ্বান, বুদ্ধিমান মানুষের কাছ থেকেই কখনও বা প্রকাশ্যে বেরিয়ে আসে, কখনও বা মনের গভীরে বিশ্বাস হয়েই বেঁচে থাকে। আসলে এঁরা অনেকেই জ্যোতিষশাস্ত্রের সঙ্গে জ্যোতির্বিজ্ঞানকে গুলিয়ে ফেলেন। গুলিয়ে ফেলেন astronomy-র সঙ্গে astrology-কে। বাংলা ও ইংরেজি দুটো কথায় এতই মিল যে দুটোকে বড় বেশি সম্পর্কযুক্ত মনে হয়। দুটোতেই গ্রহ-নক্ষত্র আছে, আছে অংক-টংকের ব্যাপার, সুতরাং এইসব কিছু মিলিয়ে মানুষ আরো বেশি করে বিভ্রান্ত হন। ভাবতে শুরু করেন জ্যোতির্বিজ্ঞান গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান বিষয়ক বিজ্ঞান এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের ওপর ভিত্তি করেই জ্যোতিষশাস্ত্র মানুষের জীবনে ওই সব গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাব নির্ণয় করে অংক-টংক কষে। কিন্তু যেমনভাবে ভাবা হয়, বিষয়টা আসলে আদৌ তা নয়। জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতিষশাস্ত্রের আলোচ্য বিষয় কী, সে নিয়ে একটু আগেই আলোচনা করেছি। তবু আবারও ওই প্রসঙ্গতে সামান্য সময়ের জন্য ফিরে যেতে চাই। কারণ
পুরাতন কথার পুনরুক্তি সকল প্রীতিকর হয় না; অথচ পুনঃ
পুনঃ না বলিলেও সম্যক ফল পাওয়া যায় না।
জ্যোতির্বিজ্ঞান একটা বিজ্ঞান; কারণ পৃথিবীর বিভিন্ন মানমন্দির (observatory) থেকে, অন্যান্য বিভিন্ন পর্যবেক্ষণকেন্দ্র থেকে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ করে গ্রহ-উপগ্রহ-নক্ষত্রগুলির অবস্থান নির্ণয় করে এবং গ্রহ-উপগ্রহ-নক্ষত্রগুলির গণিত অবস্থান বার করে মেলানো হয়। দূরবীনে দেখা অবস্থান ও গণিত-অবস্থান মিলিয়ে তৈরি হয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের সূত্র। কখনও দূরবীনে দেখা অবস্থান ও গণিত-অবস্থানে পার্থক্য দেখা গেলে সে বিষয়ে আবার গবেষণা করা হয় এবং প্রয়োজনে প্রচলিত গণিত গণনার সূত্রগুলির সংস্কার করা হয়।