জ্যোতিষশাস্ত্র বলে—একজন মানুষের জন্মকালীন গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থানের ওপর ভবিষ্যৎ জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত নির্ধারিত হয়ে যায়। জ্যোতিষশাস্ত্র কিন্তু তাদের এ জাতীয় বক্তব্যের সমর্থনে কোনও প্রমাণই আজ পর্যন্ত হাজির করতে পারেনি।
জ্যোতিষশাস্ত্রের উৎপত্তি অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে
বুদ্ধির উন্মেষের আগে মানুষ, গুহা-মানুষ দৃষ্টির শেষ প্রান্তে নীল আকাশের দিকে অবাক হয়ে দেখেছে। দেখেছে আকাশে সূর্যের উদয় ও অস্ত, অনুভব করছে দুপুরের আকাশে অবস্থানগত সূর্যের উত্তাপ, চাঁদের হ্রাস-বৃদ্ধি ও উদয়-অস্ত, তারা ভরা রাত, চন্দ্রগ্রহণ, সূর্যগ্রহণ। ধূমকেতু, উল্কাপাত, অবাক অসহায়ভাবে তারা শুধু দেখেইছে। কেন এমনটা ঘটছে—ব্যাখ্যা খুঁজে পায়নি। খুঁজে পাওয়ার মতো মানসিক উত্তরণ তখনও মানবজীবনে আসেনি। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে আবহাওয়ার পরিবর্তন, বর্ষা-গ্রীষ্ম-শীত, ঝড়-বৃষ্টি-বিদ্যুৎ-বৃষ্টি-বন্যা, খরা, জলকষ্ট, তুষারপাত, ভূমিকম্প ইত্যাদি দেখে অসহায় অবুঝ মানুষগুলো এক সময় ভাবতে শুরু করল এসবের পিছনে রয়েছে একটা শক্তি। এসব শক্তিকে তারা ভয় করতে শুরু করল। এদের তুষ্ট করতে চাইল। নিবেদন করল শ্রদ্ধা। এক সময় দেবত্বের আসনে বসাল পাহাড়-পর্বত, নদী-জল, আগুন, ঝড়, বজ্র, সমুদ্র, পৃথিবী, সূর্য, চন্দ্র ও গ্রহ-নক্ষত্রদের। প্রাচীন যুগের মানুষেরা ভাবতে শুরু করলো এইসব দেবতাদের তুষ্ট করতে পারলে খরা, ঝড়, বৃষ্টি, বন্যা, তুষারপাত, ভূকম্প, প্রভৃতি প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে তারা অব্যাহতি পাবে।
এক সময় মানুষ গোষ্ঠীবদ্ধ হল। কৃষিকাজ, পশুপালন, নৌ-চালনা শিখল। মানুষ মনে করতে শুরু করল, ওইসব প্রকৃতি-দেবতাকে তুষ্ট করলে ফলন ভাল হবে, পশু-মড়ক হবে না ধীরে ধীরে এর থেকেই সৃষ্টি হল দেবতাদের তুষ্ট করতে নানারকম আচার-অনুষ্ঠান, যাগযজ্ঞ। মানুষের জীবনে সম্পদ হিসেবে প্রবেশ করলে বৃক্ষ, অরণ্য, গরু, ছাগল, শুয়োর, আরও নানা পশু। এইসব সম্পদ মানুষের জীবনে সমৃদ্ধি আনল, সেই সঙ্গে দেবতা হিসেবে পুজোও পেতে লাগল।
গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষ তাদের গোষ্ঠীর শক্তিমান ও বুদ্ধিমান মানুষটিকে বরণ করল নেতা হিসেবে। শক্তিমান হলো শাসক। বুদ্ধিমান হলো ধর্মীয় নেতা। প্রধানত এইসব বুদ্ধিজীবী, কল্পনাবিলাসী, শ্রমবিমুখ ধর্মীয় নেতারা কল্পনার দেবতাদের নিয়ে কল্পনার তুলিতে আঁকল নানা অদ্ভুত সব কাহিনি। ধর্মীয় নেতারা নিজেদের ঈশ্বরের দূত হিসেবে প্রচার করল। এই প্রচারে প্রভাবিত সাধারণ মানুষ ধর্মীয় নেতাদের এইসব দেব-কাহিনিগুলোকে সত্যি বলে বিশ্বাস করতে শুরু করল। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে তৈরি হল বিচিত্র সব দেব-কাহিনি। আজও সেইসব দেব-বিশ্বাসের কাহিনির অনেকগুলোই বেঁচে রয়েছে আধুনিক যুগের মানুষেরও মধ্যে।