এবং অসভ্য বলে মেনে নিতে হয়। তাঁরা অসভ্য হলে আমরা তাঁদের বংশধররাও অসভ্য বলে চিহ্নিত হই।
“এছাড়া পৃথিবীখ্যাত প্রাচীন বিজ্ঞানী পিথাগোরাস, টলেমি, গ্যালিলিও, টাইকো ব্রাহে, কেপলার, ভাস্কর, শ্রীপতি প্রমুখ এবং বর্তমানকালের বহু বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানীরা যে শাস্ত্রের পক্ষে বলিষ্ঠ মত প্রকাশ করেছেন, সেই শাস্ত্রে আস্থা জানাতে লজ্জা কোথায়?”
এই যুক্তিটুকু ডঃ অসিত চক্রবর্তীর 'জ্যোতিষ-বিজ্ঞান কথা' বইটির ৫৭ পৃষ্ঠা থেকে তুলে দিয়েছি, জ্যোতিষশাস্ত্রেকে বিজ্ঞান বলে প্রমাণ করতে এই ধরনের আক্রমণমুখী যুক্তি বহু জ্যোতিষীদের কাছেই খুবই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
বিরুদ্ধ যুক্তি: জ্যোতিষশাস্ত্রের পক্ষে বা বিপক্ষে কতজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব মত প্রকাশ করলেন এমন সংখ্যাতত্ত্বের নিরিখে কোনও মতকে মেনে নেওয়া যুক্তিবাদীদের কাছে একান্তভাবেই মূল্যহীন। কারণ বিজ্ঞানমনস্ক, যুক্তিনির্ভর মানুষ সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চায় পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। কোন্ পক্ষ সংখ্যাগুরু, কোন্ পক্ষে নামী-দামিদের সমর্থন বেশি, তা দেখে নয়। ইতিহাস বার বার এ শিক্ষাই দিয়েছে, বহু ক্ষেত্রেই সংখ্যাগুরুদের, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের মতামতও বাতিল হয়েছে। তেমনটি না হলে আজও আমাদের মেনে নিতে হত ভূ-কেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্বকে। অতএব আমি চাই যুক্তিনির্ভর মানসিকতা নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে। এ-কথাগুলো আলোচনায় আগে এসেছিল, কিন্তু প্রয়োজনে আবারও উল্লেখ করতে হল।
জ্যোতির্বিজ্ঞান যখন জ্যোতির্বিদ্যা ও জ্যোতিষশাস্ত্র এই দুটি শাখায় ভাগ হয়ে যায় ভাগ হওয়ার আগে বহু জ্যোতির্বিজ্ঞানী বিজ্ঞানসাধনার পাশাপাশি কৌতূহলবশত অথবা দ্বিধাগ্রস্তভাবে অথবা বিশ্বাস নিয়ে জ্যোতিষচর্চায় মনোনিবেশ করেছিলেন। ফলে জ্যোতিষশাস্ত্র কলেবরে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু শ্রদ্ধেয় বহু জ্যোতির্বিজ্ঞানী জ্যোতিষে বিশ্বাস করতেন, অথবা এ-যুগের কিছু বিজ্ঞানী ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব জ্যোতিষে বিশ্বাস করেন—এই যুক্তিতে জ্যোতিষশাস্ত্রের সত্যতা প্রমাণিত হয় না। কারণ, বিজ্ঞানের কাছে ব্যক্তি-বিশ্বাসের দাম এক কানা-কড়িও নয়।
প্রাচীন যুগের বিশিষ্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ‘অসভ্য’ বা ‘মিথ্যাবাদী’ এমন অভিযোগ কোনও যুক্তিবাদী বা বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ তুলেছেন—এমনটা আমার জানা নেই। অনুমান করতে অসুবিধে হয় না, সাধারণ মানুষদের বিভ্রান্ত করতে, তাঁদের আবেগকে সুড়সুড়ি দিতেই এমন সব অশালীন, স্পর্শকাতর কথা বলেছেন কিছু জ্যোতিষী। তবে পাশাপাশি এ-কথাটাও স্মরণযোগ্য, প্রাচীনযুগের বহু জ্যোতির্বিজ্ঞানীরাই ভূ-কেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্বে বিশ্বাস করতেন, বরাহমিহির একটি পতাকা পুঁতে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন, পৃথিবী স্থির বলেই পতাকা একটা নির্দিষ্ট দিকে ওড়ে না। পৃথিবী ঘুরলে বাতাসে পতাকা শুধু একই দিকে উড়ত; যেমন একটা পতাকা হাতে কেউ দৌড়তে থাকলে পতাকা তার বিপরীত দিকেই ওড়ে।