তেরো: ১৯৯১ সালের এপ্রিল মাসের ঘটনা। এক মধ্য বয়স্কা মহিলা এলেন ক্যালক্যাটা ফ্যামেলি ওয়েলফেয়ার হসপিটালে। সঙ্গী একটি বছর তিরিশের তরুণ, তাঁর একমাত্র সন্তান। মহিলাটি আমার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ঝর ঝর করে কেঁদে ফেললেন। বললেন, ছেলেটি ভীষণভাবে ড্রাগ অ্যাডিক্টেড। ইনজেক্শন কুঁড়ে কুঁড়ে শরীর ঝাঁঝরা করে দিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের আর্থিক অবস্থাকেও ঝাঁঝরা করেছে। ওর বাবা রিটায়ার করেছেন বছর দেড়েক। ও একটা চাকরি করত। এখন কাজে যায় না। সব সময় নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে।
একটু একটু করে অনেক কিছুই জানলাম। ছেলেটি ভালবাসে একটি মেয়েকে। সেই মেয়েটির সঙ্গেই বিয়ে ঠিক হয়। ছেলে ও মেয়ের পক্ষ থেকে উভয়ের মা-বাবাই আলোচনা করে বিয়ের দিন ঠিক করেন। সেই দিনই ছেলের বাবা মেয়েটির বাবাকে অনুরোধ করেন, মেয়েটির জন্মকুণ্ডলী থাকলে দিতে। জন্মকুণ্ডলী পাওয়ার পর বাবা জন্মকুণ্ডলী নিয়ে হাজির হলেন তাঁদের পারিবারিক জ্যোতিষীর হাতিবাগানের চেম্বারে। জ্যোতিষী পাত্র-পাত্রীর যোটক বিচার করে জানান, মেয়েটির সঙ্গে বিয়ে হলে ছেলেটির সর্বনাশ হবে। জ্যোতিষীর মতামত শুনে মা-বাবা বিয়ে ভেঙে দেন ছেলের তীব্র ইচ্ছেকে অগ্রাহ্য করে। তারপরই ছেলে ড্রাগ নিতে শুরু করে। ড্রাগ নিচ্ছে দেড় বছর ধরে। পঁয়ষট্টি কেজি ওজন পঁয়তাল্লিশে দাঁড়িয়েছে। ভদ্রমহিলার একান্ত অনুরোধ, আমি যেন ছেলেটিকে ড্রাগের হাত থেকে বাঁচাই।
তরুণটিকে দেখে সত্যিই কষ্ট হচ্ছিল। নেশায় অর্ধ অচেতন। কথা বলতে শিথিল ঠোঁট কাঁপে। টেবিলের ওপর রাখা হাতও স্থির থাকছিল না, কাঁপছিল। শুধু জানিয়েছিল, মেয়েটির সঙ্গে বিয়ে না হলে এই ভাবেই নিজেকে শেষ করে দেবে, মা-বাবা যদি মেয়েটির সঙ্গে বিয়ে দিতে আন্তরিকভাবে রাজি হন তবেই তরুণটি আমার সঙ্গে সহযোগিতা করবে।
মাকে জানিয়েছিলাম, ড্রাগ গ্রহণকারী সাহায্য না করলে তাকে স্বাভাবিক সুস্থজীবনে স্থায়ীভাবে নিয়ে আসার সাধ্য কোনও চিকিৎসকেরই নেই। আপনারা যদি ওই মেয়েটির সঙ্গেই আপনার ছেলের বিয়ে দিতে রাজি হন, তবেই ওকে স্থায়ীভাবে সুস্থ করা সম্ভব এবং এ-বিষয়ে অবশ্যই যথাসাধ্য করব।
মা জানালেন, এখন আর মেয়েটির সঙ্গে বিয়ে সম্ভব নয়। কারণ তিনি এই বিয়ে ভাঙার জন্যেই মেয়েটির বাড়িতে গিয়ে বলে এসেছিলেন, “বিয়ে একটা চিরজীবনের পবিত্র সম্পর্কের ব্যাপার। তাই তা কোনও প্রতারণার মধ্য দিয়ে শুরু না হওয়াই বাঞ্ছনীয়। ছেলেটি আমার লম্পট। এ কথাটা আগেই জানিয়ে রাখতে চাই। লাম্পট্যের ব্যাপার ও সধবা-বিধবা, আত্মীয়-অনাত্মীয়, ছোট-বড় কোনও বাছ-বিচার করে না। বিয়ের পরে ছেলেটি ওর এমন জীবন-যাপন পদ্ধতি না পাল্টালে যাকে বিয়ে করে আনবে তার জীবন জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে শেষ করে দেবে।”