বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:অলৌকিক নয়, লৌকিক (তৃতীয় খণ্ড) - প্রবীর ঘোষ.pdf/২৩২

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
২২৬
অলৌকিক নয়, লৌকিক [তৃতীয় খণ্ড]

অন্ধবিশ্বাসের উপর ভিত্তি স্থাপন করিয়া দাঁড়াইয়া ছিল। মানুষের অজ্ঞানতাই ছিল ইহাদের ব্যবসার পুঁজি। বর্তমানে যুক্তির প্রতি আকর্ষণ সাধারণ মানুষের মধ্যে দ্রুত বিস্তার লাভ করিতেছে। যুক্তিবাদী আন্দোলনের নেতা প্রবীর ঘোষকে সম্মুখ সমরে পরাস্ত করিয়া অঙ্কুরেই যুক্তিবাদী আন্দোলনকে ধ্বংস করিতে সম্প্রতি নামী-দামি জ্যোতিষীরা একের বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ লড়াই চালাইয়াও যথেষ্টর চেয়ে বেশি পর্যুদস্ত হইয়াছেন, আকাশবাণী কলকাতা আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠানটির প্রতিক্রিয়া হইয়াছিল ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী। সমগ্র ভারতের বহু ভাষাভাষি পত্র-পত্রিকায় অনুষ্ঠানটির বিবরণ প্রকাশিত হইয়াছিল, প্রকাশিত হইয়াছিল সম্পাদকীয় পর্যন্ত। এই অভুতপূর্ব প্রতিক্রিয়া দর্শনে বহু জ্যোতিষী এবং গ্রহরত্ন ব্যবসায়ীরা যথেষ্ট ভীত হইয়াছেন। এই অবস্থাকে সামাল দিতে এইসব লোকঠকানো কার্যকলাপে লিপ্ত ব্যক্তিগণের মধ্যে কেহ কেহ সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করিবার জন্য তাহাদের কাজের সমর্থনে তথাকথিত নানা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হাজির করিয়া সেই ব্যাখ্যায় সঙ্গে জুড়িয়া দিতেছেন বিভিন্ন বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞান সংস্থার নাম।

 আমরা অত্যন্ত উদ্বেগ ও শংকার সহিত লক্ষ্য করিতেছি, সম্প্রতি এক জ্যোতিষী তাঁহার আবিষ্কৃত ‘মেটাল-ট্যাবলেট’-এর ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অত্যাশ্চর্য ক্ষমতার এক তথাকথিক ‘বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা’ দিবার অপচেষ্টা করিয়াছেন এবং ওই ব্যাখ্যার সঙ্গে এক বিশিষ্ট বিজ্ঞানীর নামও ব্যবহার করিয়াছেন।

 মানবদেহে অল্প পরিমাণে বিভিন্ন প্রকারের মৌলিক দ্রব্যের অস্তিত্ব আছে এবং নানা ধরনের রোগের চিকিৎসায় লৌহের ব্যবহার সুবিদিত। কিন্তু তাহার সঙ্গে ‘মেটাল-ট্যাবলেট’ মাদুলি করিয়া বা আংটি করিয়া ধারণে ফললাভের আকাশ-কুসুম চিন্তার কোনও সম্পর্ক নাই।

 আমাদের শরীরে রক্ত আছে। প্রয়োজনে বাহির হইতে সংগ্রহ করিয়া শরীরে রক্ত দেওয়া হয়। কিন্তু কোনও ব্যক্তি যদি হঠাৎ দাবি করিয়া বসেন-পশু বা মানুষের রক্ত গায়ে মাখিয়াই শরীরের রক্ত-স্বল্পতা দূর করা সম্ভব, তাহা হইলে তাহার মানসিক সুস্থতা সম্পর্কে সন্দেহ জাগে। কেহ যদি প্রশ্ন করিয়া বসেন—রক্ত-স্বল্পতার ক্ষেত্রে চিকিৎসাশাস্ত্রে আয়রন ট্যাবলেট-ক্যাপসুল ইত্যাদির প্রয়োগবিধি আছে, অতএব লৌহ-আংটি ধারণে ওই একই কার্য সমাধা হইবে না কেন?—তবে প্রশ্নকর্তার কাণ্ড-জ্ঞান বিষয়ে সন্দিহান হই। এইরূপ প্রশ্নকর্তা তাঁহার নিজের রক্তের স্বল্পতা দেখা দিলে ভারি লৌহখণ্ড শরীরের সর্বত্র বাঁধিয়া রাখিয়া পরীক্ষা করিলেই তাঁহার প্রশ্ন ও বক্তব্যের অসারতা বুঝিতে পারিবেন।

 মেটাল-ট্যাবলেটের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার নামে যে সকল কুযুক্তি হাজির করা হইয়াছে সেগুলিকে আমরা বৈজ্ঞানিকগণ কখনই বিজ্ঞানসম্মত যুক্তি বলিয়া গ্রহণ করিতে পারি না, কারণ ইহা পরীক্ষিত নহে। আমরা স্পষ্টতই মনে করি মানুষ ঠকাইয়া রোজগারের ধান্ধায় যাহারা এই ধরনের অপব্যাখ্যা দিবার চেষ্টা করে, তাহারা প্রতারক ও সমাজের শত্রু।