মূল শ্লোক ও এরিকা চিটহ্যামের অনুবাদের সঙ্গে ‘আলোকপাত’ এর অনুবাদের মিল খুঁজে পেলেও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের পক্ষে হাজির করা শ্লোকের মিল নেই তো শতকরা এক ভাগও। এই শ্লোকটির রচয়িতা যখন শম্ভুনাথ বাগচী এম. কম., এল. এল. বি. (অ্যাডভোকেট) স্বয়ং, তখন কেন যে নিজের রচনাকে নস্ট্রাডামুসের রচনা বলে চালাতে চাইছেন, এটা নিয়ে নিশ্চয়ই গভীর চিন্তার প্রয়োজন আছে। এ কি লেখকের অতি বিনয়ের ফল? না কি, লেখক ও বিশ্বহিন্দু পরিষদের ‘জাতের নাম বজ্জাতি’?
‘আলোকপাত’-এর কথা মতো কবিতাটিতে নস্ট্রাডামুসের নাকি ‘মূর’কথাটা ব্যবহার কারণ শ্রীলঙ্কা, ইউরোপ ও এশিয়ার এইসব অঞ্চলের মুসলমানরা ‘মূর’নামেও পরিচিত। ফরাসি ভাষায় ‘মূর’শব্দটির প্রয়োগ না থাকলেও এই কারণেই নস্ট্রাডামুস ‘মূর’কথাটি ব্যবহার করেছিলেন বলে কোনও কোনও ব্যাখ্যাকার ব্যাখ্যা করেছেন।
এই ধরনের যুক্তির ওপর নির্ভর করলে ব্যাখ্যাটা একটু অন্য রকমও হতে পারে। ‘মূর’ ও ‘মূঢ়' কথাটার উচ্চারণগত মিল লক্ষণীয়। কবিতায় ‘মূঢ়’ কথাটিকেই যে নস্ট্রাডামুস ব্যবহার করেছিলেন, এমনটি ভাবার মতো যথেষ্ট কারণ আছে। ভারতবর্ষের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের অধিবাসীদের কাছে ‘মূঢ়’ শব্দটি অর্থবহ, ‘মূঢ়’ অর্থে ‘নির্বোধ’। আর ‘নিপার নদীর’ অর্থে নিশ্চয় এপার থেকে ওপার দেখা যায় না, এমনই এক পারহীন নদীর কথাই বলতে চেয়েছিলেন। ভারতবর্ষে ‘পার’ কথাটিও প্রচলিত। নস্ট্রাডামুস ভারতবর্ষকে বোঝাতেই ভারতের বহুল প্রচারিত শব্দ দুটি এই শ্লোকে ব্যবহার করেছিলেন। তাহলে কবিতা বা শ্লোকটি থেকে আমরা কি অর্থ পেলাম?
নির্বোধদের মতাদর্শ শেষ পর্যন্ত বিলুপ্ত হবে,
বোধযুক্ত অর্থাৎ যুক্তিবাদের অমোঘ জনপ্রিয়তায়
এপার ওপার দেখা যায় না, এমনই এক নদীর পারে জন্মাবে এক শিশু
যার দর্শন, নতুন এক দর্শন ভরিয়ে দেবে সারা পৃথিবীকে নতুন ভাবে, সুন্দর ভাবে।
নস্ট্রাডামুস যুক্তিহীন, অন্ধবিশ্বাস-নির্ভর নির্বোধদের গড়ে তোলা তথাকথিত মতাদর্শের পতন অবশ্যম্ভাবী, একথা বুঝতে পেরেছিলেন। বুঝেছিলেন যুক্তিবাদের নির্ভর সাংস্কৃতিক আন্দোলনে পাল্টে যাবে সমাজের পরিবেশ, শোষিত মানুষদের সচেতনতার কাছে ধরা পড়ে যেতে থাকবে একের পর এক শোষণ কৌশল। ফলে যে আন্দোলন, জনজাগরণের আন্দোলন, তা জয়যুক্ত হবেই। সেনা দিয়ে জন-আন্দোলন কখনই রোখা যায়নি; ইউরোপের দেশগুলো থেকে মার্কসবাদের নামে কিছু ‘এলোমেলা করে দে মা, লুটেপুটে খাই’ পার্টিদের রাজ্যপাট হারানো তারই জ্বলন্ত উদাহরণ।
নস্ট্রাডামুস এ-কবিতায় বলেছিলেন, এই যুক্তিবাদী দর্শন, নিপীড়িত মানুষকে সচেতন করার দর্শন, শোষণ-মুক্তির দর্শনের স্রষ্টা জন্মাবেন ‘নিপার’ নদীর তীরে। বাস্তব ঘটনাও তো তাই-ই। আধুনিক যুক্তিবাদী দর্শনের স্রষ্টা, বন্ধু ও নির্দেশক প্রবীর