পর এবং বাম-জমানার প্রায় তিন দশক শাসনের পরও গরিবি হটল না? তাহলে সরকার কাদের জন্যে? গ্রামাঞ্চলের সংখ্যাগুরু মানুষদের জন্য নয়? শহরের মুষ্টিমেয় মধ্যবিত্ত বাবুদের জন্য?
পশ্চিমবাংলার জনগণের (জন্য) সরকার স্বাস্থ্য বিষয়ে কতটা করতে পেরেছে—আসুন একটু দেখি। মুদিয়ালি কমিটি সুপারিশ করেছিল, প্রতি হাজার জনে ১টি হাসপাতাল-শয্যার। এই রাজ্যে ৩৪১টি ব্লকের মধ্যে মাত্র ২০ ব্লক সুপারিশ কার্যকর করতে পেরেছে। ২১৫ টি ব্লকে প্রতি ৪ হাজার জনে ১টি শয্যা এবং ৭১টি ব্লকে ৮ হাজার জনে ১টি শয্যার ব্যবস্থা আছে। এই রাজ্যের স্বাস্থ্যের ভয়াবহ চিত্রটির তথ্যসূত্র: বিভিন্ন জেলার ডিস্ট্রিক্ট স্ট্যাটিস্টিকাল হ্যাণ্ডবুক, ২০০২।
আসুন চোখ রাখি রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থায়। অমর্ত্য সেনের তৈরি প্রতীচী ট্রাস্টের তরফ থেকে এক সমীক্ষা চালানো হয়েছিল রাজ্যের বিভিন্ন জেলায়। তাতে দেখা যাচ্ছে—প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্র সংখ্যা বেড়েছে। প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা গত কয়েক বছরে দু-হাজার কমেছে। তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে যাদের গৃহশিক্ষক নেই, তাদের শতকরা ৯৩ জন নিজের নামটুকুও লিখতে শেখেনি। কেন্দ্রীয় সরকারের ন্যাশনাল ইনস্টিউট অফ এডুকেশন প্ল্যানিং অ্যাণ্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন একটি রিপোর্ট তৈরি করেছেন ২০০৫ সালে। তথ্য সংগ্রহ করেছেন পশ্চিম বাংলার রাজ্য সরকারের কাছ থেকে। তাতে জানানো হয়েছে কলকাতার প্রাথমিক শিক্ষার অবস্থা। শতকরা ১২.৩ ভাগ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত ক্লাশ চলে একটি মাত্র ঘরে। মেয়েদের জন্য আলাদা শৌচাগার আছে এই শহরের মাত্র ২২ ভাগ স্কুলে। ১৪০০ স্কুলের মধ্যে ১৭০টিতে শিক্ষক আছেন ১ জন করে। শিক্ষকদের মধ্যে মাধ্যমিক পাশ না করা শিক্ষকের সংখ্যা ১১৬। দেশের চারটি মহানগর বা মেট্রো সিটির মধ্যে শিক্ষাক্ষেত্রে সবার শেষে আছে কলকাতা। মিত্র কমিশন সুপারিশ করেছিলেন—প্রাথমিক শিক্ষকদের যোগ্যতা হোক বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি। কেন আজ পর্যন্ত সেই সুপারিশ গ্রহণ করা হয়নি? বিশাল সংখ্যক বেকার স্নাতকরা কি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার থেকে বেকার থাকাটা শ্রেয় মনে করবে বলে-ই মাধ্যমিক পাশ না করা প্রার্থীদের শিক্ষক করা হচ্ছে? নাকি দলীয় কর্মীদের কথা ভেবে-ই এমন ব্যবস্থা?
হাঁড়ির একটা ভাত টিপলে সব ভাতের হাল বোঝা যায়। পশ্চিমবাংলার শিক্ষার চালচিত্র থেকে দেশের অবস্থা অনুমান করা একটুও শক্ত নয়।
আমাদের মত দরিদ্র ও উন্নতশীল দেশে সাধারণ মানুষের জীবনধারণের প্রতিটি পদক্ষেপে যেখানে রয়েছে অনিশ্চয়তা, বঞ্চনা, শোষণ, দুর্নীতি, স্বজনপোষণ ও অত্যাচার, সেখানে মানুষের জীবনে আর্থসাজাজিক পরিবেশের প্রভাব যথেষ্ট শক্তিশালী, এটা সমাজবিজ্ঞানী মাত্রেই স্বীকার করেন। এখানে স্রেফ বেঁচে থাকার তাগিদে মানুষকে নানা অসামাজিক ও অপরাধমূলক কাজে নামতে হয়। মেয়েদের নিজেকেঅলৌকিক নয়, লৌকিক [তৃতীয় খণ্ড] – ৬