বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:অলৌকিক নয়, লৌকিক (তৃতীয় খণ্ড) - প্রবীর ঘোষ.pdf/৮৮

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
৮২
অলৌকিক নয়, লৌকিক [তৃতীয় খণ্ড]

বাঁচতে, সংসারকে বাঁচাতে ইজ্জত বেচতে হয়। এদেশের বহু মানুষের কাছে বিশুদ্ধ জল পান চরম বিলাসিতা। এ-দেশে এখনও অচ্ছুতরা বর্ণহিন্দুদের কুয়ো ছোঁয়ার দুঃসাহস দেখালে তাদের ধড় থেকে মাথা যায় কাটা। হরিজন নারীকে জীবনসঙ্গিনী করার অপরাধে বর্ণহিন্দুর চাকরি যায় বা বেঁচে থাকার অধিকারটুকু পর্যন্ত কেটে নেওয়া হয়। রাজনীতিকের জাদুকাঠির ছোঁয়া না পেলে ঋণ-মেলায় ঋণ মেলে না, সরকারি চাকরি অধরাই থেকে যায়। চাকরি সুযোগ সীমিত, বেকার অসীম। ফলে কাজ পেতে খুঁটি ধরাই সেরা যোগ্যতা বলে বিবেচিত হয়। তবুও এর পরও চাকরি পাওয়া ছেলেটি ও তাদের পরিবারের সকলেই মনে করে—কাজ পাওয়াটাই বিশাল ভাগ্য, মানতে ফল, অবতারের আশীর্বাদের কেরামতি, গ্রহরত্নের ভেল্কি।

 যে দেশের পঙ্গু অর্থনীতি গ্রামে গ্রামে চিকিৎসার সুযোগ পৌঁছে দিতে পারে না, সে দেশের গ্রামবাসীরা রোগ ও মৃত্যুকে অদৃষ্টের লিখন বলে মেনে নিক—এটাই চাইবে রাষ্ট্রক্ষমতা, সরকার। আর তেমনটাই মেনে নিচ্ছে অসহায় গ্রামের মানুষরা। গরিব ঘরের মানুষের বিনে মাইনের স্কুলে সন্তান পড়াবার সাধ থাকলেও সাধ্যে কুলোয় না। ঘরের ছেলে কাজে না গিয়ে স্কুলে গেলে রোজগার করবে কে? শিশু-শ্রমের ওপরও প্রায় সমস্ত দরিদ্র পরিবারকেই কিছুটা নির্ভর করতে হয়। আবার পাশাপাশি এও সত্য—আব্রু রক্ষা করে স্কুলে যাওয়ার মতো সাধারণ পেশাটুকুও অনেকের জোটে না। পড়াশুনো ও বাইরের খবরাখবর রাখতে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা পড়ার সুযোগ যেহেতু দরিদ্রের ক্ষেত্রে খুবই কম, তাই শুধুমাত্র এই আর্থ-সামাজিক কারণেই দরিদ্র গ্রামবাসী ও শহরের বস্তিবাসীদের মধ্যে মেধা বুদ্ধি, মননশীলতা খুবই কম। গ্রামের কিশোরীদের চেয়ে শহরের গরিব কিশোরীদের অবস্থা অনেক বেশি খারাপ। এখানে একটা ঘর নামক নরকে বহু মানুষকে গাদাগাদি হয়ে ভোরের সূর্যের প্রতীক্ষা করতে হয়। ফলে অনেক সময় এরা নারী-পুরুষের গোপন ক্রিয়াকলাপ দেখে কৈশোরেই যৌন আবেগ দ্বারা চালিত হয়। আবার অনেক সময় ইচ্ছে না থাকলেও আর্থিক লালসার শিকার হতে হয়। কৈশোর পা দিয়েই অনেককে বেঁচে থাকার জন্যই যোগ দিতে হয় নানা অবৈধ কাজে। এইসব পিছিয়ে পড়া মানুষগুলো এমনতর জীবনযাত্রা ইচ্ছে করে বেছে নেয়নি, সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামোই তাদের এমনতর জীবনযাত্রা গ্রহণ করতে বাধ্য করেছে।

আর্থসামাজিক পরিবেশ যে সাধারণ মানুষকে কী বিপুলভাবে
প্রভাবিত করে সে বিষয়ে সাধারণত মনোবিজ্ঞানীরা মুখ
খুলতে চাননি। যখন খুলেছেন, তখন মানবজীবনে
আর্থসামাজিক পরিবেশের প্রভাবকে লঘু
করে দেখাতে প্রয়াসী হয়েছেন।