এতক্ষণ যে ঘটনাটি বললাম, তাতে স্মৃতির সঙ্গে সামান্য কল্পনার মিশেল দিয়েছি পাঠক-পাঠিকাদের ভোলায় পাওয়া মানুষটি মানসিকতা বোঝাতে। ঘটনাস্থল পুরুলিয়া জেলার আদ্রা শহরের উপকণ্ঠের বাউড়ি পল্লি। ওই মাঠ পার হতে গিয়ে অনেককেই নাকি ভোলায় পেত, শৈশবে এমন গল্প অনেক শুনেছি। আমার জ্যাঠতুতো মেজদাও যখন ষণ্ডা চেহারার এক প্রখর জেদি যুবক, তখন এক সন্ধ্যায় ওই মাঠ পার হতে গিয়ে তিনিও নাকি একবার ভোলার পাল্লায় পড়েছিলেন। যে মাঠ অগুনতি বার পার হয়েছেন, সে মাঠের মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে থাকা অর্জুন হরিতকির গাছের কাছে পথ ভুলেছিলেন। এদিক-ওদিক উল্টোপাল্টা ছোটাছুটি করে যখন শীতের সন্ধ্যাতেও ঘেমে নেয়ে একশা তখন সাউথ ইনস্টিটিউটের বনাদা আবিষ্কার করলেন মেজদাকে। বিহ্বল মেজদার গায়ে শীতের রাতেও বালতি বালতি কুয়োর জল ঢালতে দেখেছি।
ভোলায় ধরা যুবতীকে ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত অবস্থায় দাঁড় করিয়ে রেখে তার মাথায় অনবরত জল ঢালতে দেখেছি। আর একগাদা নানা বয়সি নারী-পুরুষের সামনে বয়স্কা মহিলাকে দেখেছি যুবতীটির অনাবৃত স্তন টিপতে। তাদের ধারণা, এইভাবে বিভিন্ন বয়সি বিভিন্ন সম্পর্কের নারী-পুরুষদের সামনে ভোলায় ধরা মানুষটিকে লজ্জা পাইয়ে দিতে পারলে ভোলায় ধরা ছেড়ে যায়।
পথিকের আত্মবিস্মৃত হওয়া বা ভুলে যাওয়া থেকেই ভোলায় ধরা কথাটি এসেছে। বিশাল ফাঁকা মাঠ অতিক্রম করতে গিয়ে কিছু কিছু সময় কারো কারো দিক বিভ্রম ঘটতেই পারে। ঠা-ঠা রোদ্দুর ও অন্ধকার রাতে এমন ধরনের দিক-বিভ্রম ঘটনার সম্ভাবনা থাকে। তার ওপর আবার মাঠটির যদি ‘ভোলায় ধরার মাঠ’ হিসেবে কুখ্যাতি থাকে, তবে তো সোনায় সোহাগা। ভোলায় ধরার আতঙ্ক থেকেই তাকে ভোলায় ধরে—ভূতে ধরার মতোই। ভোলায় ধরার ভয় আদৌ না থাকলে দিকবিভ্রম ঘটলেও ভোলায় ধরে না কখনওই।
রাত দুপুরে অতি পরিচিত পথ চলতে গিয়ে দিক ভুল করার অভিজ্ঞতা কম বেশি অনেকেরই আছে। ধরুন শিয়ালদহ স্টেশনে নেমেছেন আরো পাঁচটা দিনের মতো। রাতের আলো ঝলমল শিয়ালদহ। আপনার সঙ্গী যে দিকে এগুলো তা দেখে অবাক হলেন। “ওদিকে যাচ্ছিস কেন?” জিজ্ঞেস করতেই জবাব পেলেন, “গেট দিয়ে বেরুবো না।” আবার আপনার অবাক হওয়ার পালা। গেট আবার ওদিকে কোথায়? ও তো গেটের ঠিক উল্টো দিকে হাঁটছে। আপনি কিছুটা হতভম্ব, কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত পায়ে সঙ্গীকে অনুসরণ করতে গিয়ে আবারও অবাক হলেন। অতি স্থির ভাবে মনে হচ্ছে উল্টো দিকে হাঁটছেন