বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:অলৌকিক নয়, লৌকিক (দ্বিতীয় খণ্ড) - প্রবীর ঘোষ.pdf/৩৪৭

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
ঈশ্বরের ভর
৩৪৩

মন্ত্রসহ নাচানাচি শুরু করল।

 গম্ভীর গলায় মেয়েটি জানাল, সে ভূত নয়, ভগবান, সে ‘বড়ি-মা’ অর্থাৎ মা দুর্গা। ওঝা ওর সামনে বেয়াদপি করলে শাস্তি দেবে। ওঝা অমন অনেক দেখেছে। ভূতের ভয়ে পালাবার বান্দা সে নয়। সে তার মতো মন্ত্র-তন্ত্রে পাঠ চালিয়ে যেতে লাগল। মন্ত্র পড়া সরবের কিছুটা কাঠকয়লার আগুনে আর কিছুটা মেয়েটির গায়ে ছুড়ে মারতেই মেয়েটি অগ্নিকুণ্ড থেকে টকটকে লাল একমুঠো জ্বলন্ত কাঠ কয়লা হাতে তুলে নিয়ে ওঝাকে বলল, “এই নে ধর প্রসাদ।” ওঝার হাতটা মুহূর্তে টেনে নিয়ে ওর হাতে উপুড় করে দিল জ্বলন্ত কাঠকয়লাগুলো।

 তাপে ও যন্ত্রণায় তীব্রতায় ওঝা চিৎকার করে এক ঝটকায় কাঠকয়লা উপুড় করে ফেলে দিল। মেয়েটি কিন্তু নির্বিকার। তার চোখে-মুখে যন্ত্রণার সামান্যতম চিহ্ন লক্ষ্য করা গেল না। এমনকী, হাতে ফোস্কা পর্যন্ত নয় উপস্থিত প্রতিটি দর্শক হতচকিত, বিস্মিত। এ মেয়ে ‘বড়ি-মা’ না হয়েই যায় না। প্রথমেই নতজানু হয়ে মার্জনা ভিক্ষা করল ওঝাটি। তার বশ্যতা স্বীকারে প্রত্যেকেরই বিশ্বাস দৃঢ়তর হল।

 মেয়েটি তার মা-বাবাকে নাম ধরে সম্বোধন করে জানাল, “আমার কাছে মানত করেও মানত রাখিসনি বলে আমি নিজেই এসেছি।”

 মা-বাবা ভয়ে কেঁপে উঠলেন, মানত করে মানত না রাখতে পারার কথাও তো সত্যি। মা-বাবা মেয়ের পায়ের ওপর উপুড় হয়ে পড়লেন। মেয়েটি রাতারাতি ‘বড়ি-মা’ হয়ে গেল। আশপাশের গ্রামগুলো থেকে দলে দলে মানুষ বড়ি-মা'-র দর্শনের আশায়, কৃপালাভের আশায়, সমস্যা সমাধানের আশায় রোগ-মুক্তির আশায় হাজির হতে লাগলেন। কিশোরীটির ব্যবহারে অদ্ভুত একটা পরিবর্তন এসে গেছে। কেউ জুতো পায়ে, লাল পোশাক পরে বা চশমা পরে ঢুকতে গেলেই ভর্ৎসনা করছে। বড়দেরও নানা ধরনের আদেশ করছে। ভক্তরা ফল, ফুল, মেঠাইয়ে ঘর ভরিয়ে তুলতে লাগলেন। শঙ্খ-ঘণ্টা বাজিয়ে ধূপ-দীপ জ্বালিয়ে চলতে লাগল বড়ি-মার পুজো। এরই মধ্যে বড়ি-মার কিছু সেবিকাও জুটে গেছে। বড়ি-মার আবির্ভাবের দিন দুয়েকের মধ্যে এক বয়স্কা বিবাহিতা সেবিকা ঘন ঘন ফিট হতে লাগলেন। এক সময় বড়ি-মার মতন মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে ঘোষণা করলেন তিনি ‘ছোটি-মা’। একই ঘরে দু-মায়েরই পুজো শুরু হয়ে গেল।

 কিশোরী ও বিবাহিতা মহিলার ওপর বড়ি-মা ও ছোটি মা-র ভরের কাহিনি