আর ‘গরিব’ এই ধরনের দুটি শ্রেণির মানুষ যদি থাকে, তবে ধনীরা তো নিজেদের স্বার্থেই গরিবদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য যতটুকু নিতান্তই দেওয়া প্রয়োজন, তার বেশি দিতে চাইবে না। ছলে, বলে, কৌশলে গরিবদের ন্যায্য পাওনাটুকু থেকে বঞ্চিত করবে। শোষণ না করলে কাকে বঞ্চিত করে ধনী হবে? আবার গরিবদের বাঁচতেও হবে নিজেদেরই প্রয়োজনে। গরিবরা না বাঁচালে কাদের শ্রমে ধনী হবে? কাদের শোষণ করবে? ওরা জোঁকের মতোই এমন চতুর সারল্যে নিঃশব্দে গরিষদের শোষণ করতে চায়। তাই কতই না ব্যাপক ব্যবস্থা, কতই না অসাধারণ প্রচার। ওরা আমাদের ঢালাও অধিকার দেয় চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধা গ্রহণের, শিক্ষা গ্রহণের এবং আরও অনেক কিছুর, কিন্তু অধিকার রক্ষার কোনও ব্যবস্থা করে না। গরিব ঘরের মানুষের বিনে মাইনের স্কুলে সস্তান পড়াবার স্বাদ থাকলেও সাধ্যে কুলোয় না। ঘরের ছেলে মেয়ে পড়তে গেলে রোজগার করবে কে? শিশু শ্রমের ওপর প্রায় সমস্ত দরিদ্র পরিবারকেই কিছুটা নির্ভর করতে হয়। এটাও কঠিন সত্য যে আব্রু রক্ষা করে স্কুলে যাওয়ার মতো সাধারণ পোশাকটুকুও অনেকের জোটে না। এখন এইসব নির্যাতিত মানুষদের গরিষ্ঠ অংশই মনে করেন—এসবই গত জন্মের পাপের ফল। এখনও অদ্ভুৎ রক্তে হোলি খেলা হয়। এখনও ওরা পানীয় জলের ছিটে-ফোঁটা পেতে কুয়োর কাছে অপেক্ষা করে। উচ্চবর্ণের কেউ কৃপা করে তাদের পাত্রে সামান্য জল ঢেলে দিলেই এঁরা নিজেদের ভাগ্যবান মনে করেন। নতুবা পান করেন খাল বিল ডোবার দূষিত জল।
’৮১ মার্চের একটি ঘটনা। আমাদের সমিতির চাইবাসা ও জামশেদপুরের সদস্য মারফত খবর পেলাম বিহারের সিংভূম, গুমলা ও সাহেবগঞ্জ জেলায় এক অজানা রোগে আক্রান্ত হয়ে গত এক মাসের ভিতর মারা গেছে একশোর ওপর মানুষ। এটা অবশ্য সরকারি মত। আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে বহু গবাদি পশু। ইতিমধ্যে এই অসুস্থতার খবর এসেছে সংলগ্ন ওড়িশা ও মধ্যপ্রদেশের অঞ্চল সমূহ থেকে। সিংভূম জেলার ওপর একটা বিস্তৃত রিপোর্ট পেলাম। রোগাক্রান্তরা সকলেই আদিবাসী, দরিদ্র, নিরক্ষর ও সংস্কারাচ্ছন্ন। রোগটা এই ধরনের- রোগীর ধুম জ্বর হচ্ছে, গাঁটে গাঁটে ব্যথা, মাথায় যন্ত্রণা, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, গলা বুজে যাওয়া এবং তিনচার দিনের মধ্যে মৃত্যু। অজানা রোগটি সম্পর্কে স্থানীয় আদিবাসীদের ধারণা—এসবই বোঙ্গার অভিশাপের ফল। রোগের শিকার যেহেতু অতি অবহেলিত সম্প্রদায় এবং এই মৃত্যুর জন্য, রোগভোগের জন্য তাদের সরকার ও সরকারি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই, অভিযুক্ত করছে নিজেদের