পাতা:অলৌকিক নয় লৌকিক (প্রথম খণ্ড) - প্রবীর ঘোষ.pdf/৩০১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।
৩০৪
অলৌকিক নয় লৌকিক (প্রথম খণ্ড)
৩০৪

৩০৪ অলৌকিক নয়, লৌকিক (প্রথম খণ্ড) | পরলােকের পাথেয় হিসেবে অনেক সময় মৃতের সঙ্গে প্রয়ােজনীয় জিনিসপত্রও কবর বা সমাধিতে দিয়ে দেওয়া হয়। মিশর, চীন, গ্রীস ও ভারতের কবরের সঙ্গে পাথেয় হিসেবে বহু নিত্যপ্রয়ােজনীয় জিনিস ও মূল্যবান অলংকার রত্ন প্রভৃতি দেওয়ার প্রচলন বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ের মধ্যে ছিল এবং আছে, মিশরের ফারাও পরিবারের মৃতের সঙ্গে কবর দেওয়া হতাে জীবন্ত দাস-দাসীদের। বৈষ্ণবরা মৃতের সমাধির সঙ্গে ভিক্ষের ঝুলিও দিয়ে দেন। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে রয়েছে অশৌচ পালনের আচরণবিধি। হিন্দু পরিবারে কেউ মারা গেলে, জ্ঞাতি-আত্মীয়দের অশৌচ পালন করার বিধি রয়েছে, এই সময় নিরামিষ খেতে হয়, বাড়িতে পূজো, বিয়ে বা ওই জাতীয় কোনও শুভকাজ করা যায় না, চামড়ার জুতাে পরা, চুল-দাড়ি-গোঁফ কাটাও নিষিদ্ধ বলে মানা হয়। এই নিয়ম মানা হয় শ্রাদ্ধের দিন পর্যন্ত। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রদের বর্ণাশ্রম অনুযায়ী মৃত্যুর কতদিন পর শ্রাদ্ধের কাজ কর্ম, আত্মাকে পিণ্ডিদান ইত্যাদি হবে, তা ঠিক করা আছে। মৃতের শ্রাদ্ধের কাজ যে করবে (ছেলে থাকলে অবশ্যই ছেলে) তাকে আরও অনেক নিয়ম-কানুন মানতে হয়। অশৌচ চলাকালীন সেলাইহীন এককাপড়ে থাকতে হয়। নিজে হাতে মাটির মালসায় ভাতে-ভাত রান্না করে খেতে হয়, যাকে বলা হয় হবিষ্যান্ন। জুতাে পরা চলবে না। রােদ-বৃষ্টি যাই হােক ছাতা নেওয়া চলবে না। চুল-দাড়ি-গোঁফ ছাঁটা চলবে না। গায়ে মাথায় তেল-দেওয়া বা সাবান দেওয়া অবশ্যই চলবে না। যৌনসঙ্গম নিষিদ্ধ। তারপর তাে রয়েছে আত্মার শ্রাদ্ধ-শান্তির নাম করে পুরােহিতকে মৃতব্যক্তির প্রিয় জিনিসপত্র দান, ব্রাহ্মণ ও আত্মীয়-বন্ধুদের ভূরিভােজে আপ্যায়ন ইত্যাদি। | শ্রাদ্ধের কাজ যিনি করবেন তিনি বেচারা তেল, সাবানহীন রুক্ষ চুল ও এক মুখ অপরিচ্ছন্ন গোঁফ-দাড়ি নিয়ে, খালি গায়ে একটা নােংরা কাপড় পরে, খালি পায়ে এবং নিজের রান্না নিজে করে প্রায়শই অফিসের কাজে যােগ দিতে পারেন । ফলে নষ্ট হয় বেশ কিছু প্রয়ােজনীয় শ্রমদিবস। গরিবদের অনেক সময় ভিটে-মাটি বেচে শ্রাদ্ধ-শাস্তির খরচ যােগাতে হয়। অস্তিত্বহীন আত্মার নামে এই যে জঘনা কুসংস্কার ও অর্থহীন খরচ যুগযুগ ধরে চলে আসছে আজও আমাদের সমাজ কিন্তু তার বাইরে বেরিয়ে আসতে পারছে না। পাছে লােকে কিছু বলে এই তাড়নায় আত্মার অস্তিত্বে অবিশ্বাসী অনেকেও এই কুসংস্কারের কাছে মাথা নােয়াচ্ছেন। যাঁরা এই সব কুসংস্কারের বিরুদ্ধে দৃঢ়তার সঙ্গে রুখে দাঁড়ান, তাঁদের বিরুদ্ধে একদল লােক-কুবাক্য প্রয়ােগ করতে পারেন বটে, কিন্তু, একই সঙ্গে আর একদল লােকের চোখে শ্রদ্ধার আসনও পাতা হয়ে যায়। কারণ, কথায় ও কাজে যাঁরা এক, তাদের শ্রদ্ধা জানাবার মতাে লােক আজও আছেন। | আমার বাবা মারা যান ১৯৮৫-র ২৬ মে। আমিই বাবার একমাত্র ছেলে। আমার বােন—চার। একমাত্র ছেলে হওয়ার সুবাদে হিন্দুধর্মের বিধিমতাে বাবার পরলােকগত