পাতা:আত্মকথা - সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf/১৭১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গোস্বামী প্ৰভুকে লইয়া পিতৃদেব তত্ত্ববোধিনী পাঠ করিতেন ; সকলেই আগ্রহে শ্ৰবণ। করিতেন ; এবং লিখিত কথার ভক্তিপূর্বক আলোচনা করিতেন । তবে রাজা রামমোহন রায় অনাচারী ছিলেন, বিলাতে গিয়া তাহার মৃত্যু হয়, ব্ৰহ্মবাদ যাহায় তাহার জন্য নহে, কলিকাতার ব্ৰাহ্মণগণ জাতি মানেন না, আচার বিচার কিছু মানেন না, এ সকল কথাও সময়ে সময়ে হইত। পূর্বেই বলিয়াছি, বামনদাস বাবুর ক্রিয়াশীলতায় বীরনগর গ্রাম সনাতন ধৰ্ম্মের এক প্ৰকাবা কেন্দ্রভূমি ছিল, কিন্তু পিতৃদেবের স্বভাবগুণে সেই কেন্দ্ৰভূমিতে তত্ত্ববোধিনীর প্রতিপত্তি প্রচারের ত্রুটি হয় নাই। তত্ত্ববোধিনী দ্বারাই বাঙ্গালা গদ্যের সহিত ব্ৰাহ্মধৰ্ম্মের বিশেষ একটু সম্বন্ধ ছিল । তত্ত্ববোধিনীতে বিদ্যাসাগর মহাশয় এবং অক্ষয়কুমার দত্ত উভয়েই লিখতেন । বিদ্যাসাগর মহাশয়কে ব্ৰাহ্ম লেখক বলা যাইতে পারে না ; অক্ষয়কুমার দত্তকে বলিতেই হইবে । বিদ্যাসাগর মহাশয় এবং অক্ষয়কুমার দত্ত উভয়েই সাধু বাঙ্গালার লেখক , উহাদের দুইজন হইতেই বাঙ্গালা গদ্যের গৌরব, সে বাঙ্গালা সাধুবাঙ্গালা। কিন্তু প্ৰচলিত বাঙ্গালা ভাষায় প্ৰথমে লেখনী চালনা করেন, পন্থা প্ৰদৰ্শন করেন,-প্যারীচাঁদ মিত্র ওরফে টেকচাঁদ ঠাকুর। পূর্বে বলিয়াছি, আমি ঈশ্বর গুপ্তের পদ্য পড়িতাম, তাহাতেই বুঝিয়াছিলাম যে, প্ৰচলিত বাঙ্গালা অবহেলার সামগ্ৰী নহে। তাহার পর সেই সময়েই যখন প্যারীচাঁদ মিত্রের “মাসিক পত্র” পড়িতে পাইলাম, তখনই বুঝিলাম, সে সহজ সরল চলিত বাঙ্গালায়, বাঙ্গালা দেশের কথা, বাঙ্গালীর ঘরের কথা, বাঙ্গালীর সদাচার অনাচারের কথা, হাসি তামাসার কথা, লিখিলেও সুপাঠ্য গ্ৰন্থ হয় । অক্ষয়কুমারের বাহবিস্তুতে জ্ঞানের কথা পড়িতাম ; সকল কথা বুঝিতে পারিতাম না । বিদ্যাসাগরের বেতাল-পাঁচিশে পূর্বকালের কথা পড়িতাম । “পূর্বকালে উজয়িনী নগরে গন্ধৰ্ব্বসেন নামে এক নরপতি ছিলেন ।” “বৰ্দ্ধমান নগরে রূপসেন নামে এক নরপতি ছিলেন।” এইরূপ সকলই সেকালের কথা,-ছিলেন আর করিয়াছিলেন । কিন্তু টেকচাঁদ ঠাকুরে এই কালের, এই বাঙ্গালির প্রাত্যহিক জীবনের কথা, ঘরকমার কথা, সমাজের কথা, সহজ কথায় দেখিতে পাইলাম। সেই শিশু জীবনে অক্ষয়কুমার, বিদ্যাসাগরের গাম্ভীৰ্য্যে, রচনাচ্ছিটায়, ভাবের ঘটায় ভুলিয়া ছিলাম। টেকচাদের বিনা আড়ম্বর সরলতায়ও সেইরূপ বিমুগ্ধ হইলাম। গদ্যের গঙ্গাযমুনাস্রোত, আর ঈশ্বর গুপ্তের পন্থের সরস্বতী আমার বাল্যজীবনের প্রয়াগস্থলে সমানে বহিতে লাগিল। আমি সেই মহা সঙ্গমতীর্থে মহানন্দের সহিত হাসিতেহাসিতে কৃতাৰ্থতা লাভ করিলাম । ধৰ্ম্মচৰ্চার জন্য খৃষ্টানদের বাঙ্গালা মাসিকপত্রে ছিল। কলিকাতার ধৰ্ম্মসভার মাসিকপত্র ছিল। তত্ত্ববোধিনীতে ধৰ্ম্ম, সাহিত্য, বিজ্ঞান, দর্শনের চর্চা হইত। কিন্তু সামাজিক কথা লইয়া মাসিকপত্রে আন্দোলন প্যারীচঁাদ মিত্ৰই প্ৰথম করেন। পিতা-পুত্র-৩ wQ,»