পাতা:আত্মচরিত (প্রফুল্লচন্দ্র রায়).djvu/১০৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


তৎক্ষণাৎ এক হন্দর সিরাপ ফেরি আইওডাইডের জন্য অর্ডার দিলেন এবং আমার যতদর সমরণ হয়, এক হন্দর ফেরি সালফের জন্যও তিনি অর্ডার দিয়াছিলেন। যখন আমার হাতে এই অডার আসিল, আমার আনন্দের আর সীমা রহিল না। কলেজ হইতে ফিরিয়া প্রত্যহ অপরাহ্লে (প্রায় ৪০টার সময়) আমি পর্বদিনের প্রাপ্ত অর্ডারগুলি দেখিতাম এবং যাহাতে ঐ সব জিনিস শীঘ্র সরবরাহ হয় তাহার ব্যবস্থা করিতাম। কলেজ লেবরেটরী হইতে আমার ফামেঁসীর লেবরেটরীতে যাওয়া আমার পক্ষে বিশ্রামের মতই ছিল। আমি তৎক্ষণাৎ আমার নতন কাজে প্রবত্ত হইতাম এবং অপরাহু ৪০টা হইতে সন্ধ্যা ৭টা পৰ্যন্ত থাটিয়া কাজ শেষ করিতাম। কাজের সঙ্গে আনন্দ থাকিলে তাহাতে সবাস্থ্যের ক্ষতি হয় না। ষে সমস্ত ঔষধ বিদেশ হইতে আমদানী হইত, তাহাই এদেশে প্রস্তুত করিতে পারিতেছি, এই ধারণাই আমার মনে বল দিত। সিরাপ ফেরি আইওডাইড, সিপরিট অব নাইট্রিক ইথর, টিংচার অব নক্সভমিকা প্রভৃতি প্রকৃতপক্ষে লেবরেটরীতে তৈরী হয়, কেন না ঐগুলি প্রস্তুত করিতে শিক্ষিত রাসায়নিকের প্রয়োজন। প্রত্যেকটি নমনার জন্য গ্যারান্টি দিতে হইবে, ইহার জন্য বিশেলষণের ক্ষমতা চাই। এই সময় আমার পক্ষে একটী বিষম অনৰ্থপাত হইল। অমল্যের ভগ্নীপতি সতীশচন্দ্র সিংহ রসায়ন শাস্ত্রে এম, এ, পাশ করিয়া আইনের পড়াও শেষ করে। মামলী প্রথায় আইন পরীক্ষায় পাশ করিয়া সে হয়ত ওকালতী আরম্ভ করিত। কিন্তু অমল্যের আদশে তাহার চিত্ত অনুপ্রাণিত হইল, সে নিজের রাসায়নিক জ্ঞান কাজে লাগাইতে ইচ্ছক হইল এবং এই উদ্দেশ্যে আমাদের নতন ব্যবসায়ে যোগ দিল। একটা নতন ব্যবসায়, ভবিষ্যতে যাহার বারা বিশেষ কিছু লাভের আশা নাই, তাহার কাজে এইভাবে আত্মোৎসর্গ করা কম আত্মবিশ্বাস ও সৎসাহসের পরিচায়ক নহে। এরপ কাজে কঠোর পরিশ্রমের জন্য প্রস্তুত হইতে হয় এবং কিছুকালের জন্য লাভের কোন আশাও মন হইতে দীর করিতে হয়। যবেক সতীশ আমার একজন প্রধান সহকারী হইল, সে কিছু মলধনও ব্যবসায়ে দিয়াছিল। রাসায়নিক কাজে এ পর্যন্ত বলিতে গেলে আমি এককই ছিলাম এবং আমার পক্ষে অত্যন্ত বেশী পরিশ্রমও হইত। তাছাড়া যে অবসর সময়টুকুতে আমি অধ্যয়ন করিতাম, তাহাও লোপ হইয়াছিল, আমি সতীশকে আমার উদ্ভাবিত নতন প্রণালীর রহস্য বাঝাইতে লাগিলাম এবং সে শিক্ষিত রাসায়নিক বলিয়া শীঘ্রই এ কাজে পটতা লাভ করিল। আমরা দুইজন একসঙ্গে প্রায় দেড় বৎসর উৎসাহসহকারে কাজ করিলাম এবং আমাদের প্রস্তুত বহু দ্রব্যের বাজারে বেশ চাহিদা হইল। কোন কোন চিকিৎসক তাঁহাদের ব্যবস্থাপত্রে যতদর সম্ভব আমাদের ঔষধ ব্যবহার করিতে লাগিলেন। কিন্তু বিধাতার ইচ্ছা আমাকে ভীষণ অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়া উত্তীণ হইতে হইবে। একদিন বৈকালে আমি অভ্যাসমত ভ্রমণে বাহির হইয়াছিলাম। রাত্রি ৮টার সময় বাড়ী ফিরিয়া শুনিলাম, সতীশ আর নাই। বজ্রাঘাতের মতই এই সংবাদে আমি মহোমান হইলাম। দৈবক্রমে হাইড্রোসায়ানিক অ্যাসিড বিষে তাহার মৃত্যু হইয়াছে। আমি প্রায় জ্ঞানশন্য অবস্থায় মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের দিকে ছটিলাম। সেখানে সতীশের মতদেহ স্ট্রেচারের উপরে দেখিলাম। আমি নিশ্চল প্রস্তরমতির মত বাহ্যজ্ঞান শান্য হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলাম— বহনক্ষণ পরে প্রকৃত অবস্থা আমি উপলব্ধি করিতে পারলাম। এই তরণ যবেক জীবনের আরম্ভেই কালগ্রাসে পতিত হইল, পশ্চাতে রাখিয়া গেল তাহার শোকসতপ্ত বন্ধ পিতামাতা এবং তরণী বিধবা পত্নী। অমূল্য ও আমার মানসিক যন্ত্রণা বর্ণনার ভাষা नाइँ। আমাদের বোধ হইল, আমরাই যেন সতাঁশের মৃত্যুর কারণ। সেই ভীষণ দর্ঘটনার