পাতা:আত্মচরিত (প্রফুল্লচন্দ্র রায়).djvu/৩০৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


হইত। প্রত্যেক গ্রাম্য পঞ্চায়েতের গোচর জমি (২) ছিল,—সেখানে নিবিবাদে গর চরিয়া খাইত। ধান কাটা ও মলা হইলে প্রচুর খড় পাওয়া যাইত এবং তাহা গরর খাদ্যের জন্য গাদা দিয়া রাখা হইত। গ্রীষ্মকালে ঘাস দলভ হইলে, এই খড় খুব কাজে লাগিত। এক কথায়, প্রত্যেক পরিবারই কিয়ং পরিমাণে আত্মনিভার ছিল। এখনকার মত সাবানের এত প্রচলন ছিল না, বড় লোকেরাই কেবল ইহা ব্যবহার করিতেন। কাপড় কাচা প্রভৃতির জন্য সাজিমাটির খাব প্রচলন ছিল। গরীব গহস্থেরা কলাপাতার ক্ষারের সঙ্গে চুণ মিশাইয়া গরম জলে সিদ্ধ করিয়া কাপড় ধাইত। ঢাকাতে এক প্রকারের গোলা সাবান হইত। পটগাঁজেরা ঢাকায় ১৬শ শতাব্দীতে বসতি করে, তাহাদের নিকট হইতেই সম্ভবতঃ লোকে এই সাবান তৈরী করার কৌশল শিখিয়াছিল। বাংলা ও হিন্দী সাবান’ শব্দ খুব সম্ভব পটগোঁজ 'Savon' হইতে আসিয়াছে। বাংলার নৌ-বাণিজ্য তখন কোষ, বালাম, সোদপুরী প্রভৃতি নানা প্রকারের দেশী নৌকা যোগে হইত। যাত্রীবাহী নৌকা স্বতন্ত্র রকমের ছিল। বজরাতে বড় লোকেরা যাইতেন, সাধারণ লোকে পানসাঁ তাপরী প্রভৃতিতে চড়িত। প্রত্যেক গ্রামেই এরপে শত শত নৌকা থাকিত। বন্দর ও গঞ্জে ঘাটে নৌকার ভিড় লাগিয়া থাকিত এবং সে দশ্য বড় সন্দের দেখাইত। কলিকাতা হইতে গ্রামে এই সব নৌকাতে যাতায়াতের সময় বড় আনন্দ বোধ হইত। স্রোতের মুখে নৌকাগুলি যখন সারি বধিয়া দাঁড় টানিয়া যাইত অথবা উজানে পাল তুলিয়া ছটিত, তখন বড়ই মনোহর দেখাইত। এখন এসব অতীতের কথা বলিলেই হয়। ব্রিটিশ কোম্পানী সমহের ষ্টীমার বাংলার নদীপথ আক্ৰমণ করিয়া এই বিপর্যর ঘটাইয়াছে। বেভারিজ তাঁহার বাখরগঞ্জ’ গ্রন্থে ১৮৭৬ সালে এদেশের নদীবাহী নৌকা ও তাহাদের নিমাণ প্রণালীর নিম্নলিখিত রূপ বর্ণনা করিয়াছেন – “এই জেলায় নৌকা নিমাণ একটি চমৎকার শিল্প। মেলিদগঞ্জ থানার এলাকার দেবাইখালি ও শ্যামপুর গ্রামে উৎকৃষ্ট কোষ নৌকা তৈরী হয়। আগরপরের নিকট ঘণ্টেশ্ববরে, এবং পিরোজপর থানার এলাকায় বর্ষাকাটী গ্রামে ভাল পানসী নৌকা তৈরী হয়। শেষোক্ত স্থানে উৎকৃষ্ট মালবাহী নৌকাও তৈরী হয়। সন্দেরবনে মগেরা কেরয়ো গাছের গড়ি হইতে ডিঙী তৈরী করে; শাদরী কাঠের ডিঙী সবারই হয়; কালকাঠী, কালিগঞ্জ, বাখরগঞ্জ, ফলাগড় প্রভৃতি স্থানও নৌকা তৈরীর জন্য বিখ্যাত।” এইরপে নৌকা তৈরীর কাজ করিয়া বহু লোক জীবিকা নিবাহ করিত। আমার বাল্যকালে কোন বাড়ীতে আমি চরকা কাটিতে দেখি নাই। ম্যানচেস্টারের কাপড় তখনই সদরে গ্রাম পৰ্যন্ত পে'ছিয়াছিল এবং জোলা ও তাঁতিরা তাহদের মৌলিক বত্তি হইতে বিতাড়িত হইয়াছিল। তাহদের মধ্যে কেহ কেহ বিলাতী কাপড় বিক্ৰী করিয়া কন্টে জীবিকা নিবাহ করিত, এবং অন্য অনেকে বাধ্য হইয়া কৃষিকাষ করিতে আরম্ভ করিয়াছিল। ইহার ফলে জমির উপর অতিরিক্ত চাপ পড়িয়াছিল। (২) পবাবস্থার তুলনায় বাংলায় গোজাতির কিরাপ অবনতি এবং দধের অভাব ঘটিয়াছে, তাহার প্রমাণ স্বরুপ নিনোধত বিবরণী উল্লেখ করা পারে। “বাংলার অধিকাংশ জেলায় গোচর জমি বলিয়া কিছু নাই। লোকসংখ্যা বন্ধির দরণে জমিদারেরা প্রায় সমস্ত কষণযোগ্য জমিই প্রজাদের নিকট বিলি করিয়াছেন এবং এগুলিতে চাব হইতেছে।.....অধিকাংশ গ্রামে গরগালিকে ক্ষেতে, আমবাগানে অথবা পাকুরের ধারে ছাড়িয়া দেওয়া হয়। সেখানে তাহারা কোন রকমে চরিয়া খায়। গররে খাদ্যশস্য বাংলা দেশে চাব করা হয় না বলিলেই হয়।” মোমেন-কৃষি কমিশনে সাক্ষ্য।