পাতা:আত্মচরিত (প্রফুল্লচন্দ্র রায়).djvu/৩০৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


তখনকার দিনে গ্রাম্য কমাকার একটা প্রধান কাজ করিত। (৩) তাহার দোকানে সন্ধ্যাবেলা আভা বসিত এবং গ্রামের রাজনীতি আলোচনা হইত। কমাকার লাগল, কোদাল, দা, দরজার কাজা, বড় কাঁটা, তালা প্রভৃতি তৈরী করিত। বাহির হইতে আমদানী লৌহপিণ্ড ও লোহার পাত হইতেই এ সব অবশ্য তৈরী হইত। নাটাগোড়িয়া (কলিকাতার নিকট), ডোমজুড়, মাকড়দহ, বড়গাছিয়া (হাওড়া) প্রভৃতি স্থানে লোহার তালা চাবি তৈরী হইত। কিন্তু জামানী হইতে আমদানী সন্তা জিনিষের প্রতিযোগিতায় এই দেশীয় শিল্প লতিপ্রায় হইয়াছে। শেফিল্ডের ছরি, কাঁচ প্রভৃতিও এদেশ ছাইয়া ফেলিতেছে। ক্ষর, ছয়রি প্রভৃতি সমস্তই বিদেশ হইতে আমদানী। চাউলের পরেই গড় ও চিনি যশোরের সবাপেক্ষা প্রধান শিল্প ছিল। খেজুর রস হইতেই প্রধানতঃ গড় ও চিনি হইত। বতমানে জাভা হইতে আমদানী সস্তা চিনির প্রতিযোগিতায় এদেশের চিনি শিল্প লোপ পাইতে বসিয়াছে। কিন্তু এক সময়ে এই চিনি শিল্প যশোরে কিরপে উন্নতি লাভ করিয়াছিল, ওয়েস্টল্যান্ডের “যশোর” নামক গ্রন্থে (১৮৭১) তাহার চমৎকার বর্ণনা আছে। “যশোর জেলার সবত্রই চিনি তৈরী হয় বটে কিন্তু জেলার পশ্চিম অংশে নিম্নলিখিত স্থানগুলিতেই চিনি তৈরীর বড় কেন্দ্ৰ —কোটচাঁদপুর, চৌগাছা, ঝিকরগাছা, ত্রিমোহিনী, কেশবপর, যশোর ও খাজরা এই সব পথানে চিনি তৈরী হয় ও তথা হইতে বাহিরে রপ্তানী হয়। কলিকাতা ও নলচিটি এই দুই স্থানেই প্রধানতঃ চিনি রপ্তানী হয়। নলচিটি বাখরগঞ্জ জেলার একটি বাণিজ্যকেন্দ্র। পবোঞ্চলের প্রায় সমস্ত জেলার সঙ্গে ইহার কারবার আছে। এখানে দলয়া চিনির খাব চাহিদা এবং কোটচাঁদপর ব্যতীত যশোর জেলার অন্যান্য স্থানে উৎপন্ন অধিকাংশ দলয়া নলচিটি ও তাহার নিকটবতী ঝালকাটিতে রপ্তানী হয়। কোটচাঁদপর ব্যতীতও ঐ দুই স্থানে দলয়া চালান হয় বটে, কিন্তু সেখানকার বেশীর ভাগ দলয়া কলিকাতাতেই চালান হয়। কলিকাতায় দই প্রকার চিনির চাহিদা আছে। প্রথমতঃ, কলিকাতায় বিক্ৰয়ের জন্য দলয়া চিনি। দ্বিতীয়তঃ, উৎকৃষ্ট পাকা (সাফ) চিনি, ঐগুলি কলিকাতা হইতে ইয়োরোপ ও অন্যান্য স্থানে চালান হয়। এই পাকা বা সাফ চিনি যশোর জেলার দক্ষিণ অঞ্চলে কেশবপুর ও অন্যান্য স্থানে তৈরী হয়, এবং দলয়া চিনি প্রধানতঃ কোটচাঁদপরে হয়।” । ১৮oo শত খৃস্টাব্দে বাংলা দেশে কিরাপে চিনি তুৈরী হইত, তাহার একটি সন্দের বিবরণ নিনে উধত হইল – “গ্রেট ব্রিটেনে চিনির দাম হঠাৎ বাড়িয়া যায়, উহার কারণ, প্রথমতঃ ওয়েস্ট ইন্ডিসে ফসল জন্মে না, এবং দ্বিতীয়তঃ ইয়োরোপের সবত্র চিনির ব্যবহার বন্ধি পায়। এইভাবে চিনির মল্য বধি ব্রিটিশ জাতি বিপদরপে গণ্য করিল। তাহদের দটি তখন বাংলার উপরে পড়িল এবং তাহারা নিরাশ হইল না। অলপ সময়ের মধ্যেই বাংলা হইতে ব্রিটেনে (৩) লালবিহারী দে তাঁহার Bengal Peasant Life গ্রন্থে গ্রাম্য কর্মকারের নিম্নলিখিত রাপ বৰ্ণনা করিয়াছেন – “কুবের ও তাহার পত্র নন্দ সমস্ত দিন কাষে নিরত থাকে, এবং রাত্রি বিপ্রহরের পর্বে তাহারা বিশ্রাম নেয় না। বেলায় তাহাদের নিকটে যাহারা কাজের জন্য আসে, তাহারা অবশ্য সন্ধ্যার পর থাকে না। কিন্তু বন্ধ বান্ধবেরা ঐ সময় আলাপ করিতে আসে। কিন্তু বন্ধর থাকুক আর না থাকুক, পিতা ও পত্র তাহাদের কাজে কখনো অমনোযোগী হয় না। পিতা ও পরে উভয়েই আগণে পোড়া একখণ্ড লাল লোহা লইয়া হাতুড়ী দিয়া পিটিতে থাকে এবং চারিদিকে অলিম্ফলিঙ্গ ছড়াইতে থাকে।”