পাতা:আত্মচরিত (প্রফুল্লচন্দ্র রায়).djvu/৩০৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


উত্তর বঙ্গের রংপর প্রভৃতি জেলায় “পাটের সন্তা-কাটা ও বোনা খাব প্রচলিত ছিল। উদ্ধ হইতে গহস্থের ব্যবহারোপযোগী বিছানার চাদর, পদা, গরীব লোকদের পরিচ্ছদ প্রভৃতি তৈরী হইত। ১৮৪০ সালের কোঠায়, কলিকাতা হইতে উত্তর আমেরিকা ও বোবাই বন্দরে তলার গাইট বধিবার জন্য চট রপ্তানী হইত; কিন্তু চিনি ও অন্যান্য জিনিষ রপ্তানী করিবার জন্য বসতা তৈরীর কাজেই পাট বেশী লাগিত ।” ডাঃ ফরবেশ রয়েল তাঁহার "Fibrous Plants of India" (১৮৫৫ খৃঃ প্রকাশিত) নামক গ্রন্থে হেনলি নামক জনৈক কলিকাতার বণিকের নিকট হইতে প্রাপ্ত নিম্নলিখিত বর্ণনা লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। এই বর্ণনা হইতে বঝো যায়, পাট শিল্প বাংলার অন্যতম প্রধান শিল্প হইয়া উঠিয়াছিল এবং এখানকার হাতে বোনা চট ও বস্তা পথিবীর দেশ দেশান্তরে রপ্তানী হইত। 重 “পাট হইতে যে সমস্ত জিনিষ তৈরী হইত, তাহার মধ্যে চট ও চটের বস্তাই প্রধান। নিন বঙ্গের প্রবাঞ্চলের জেলাগুলির ইহাই সবাপেক্ষা প্রধান গাহথ্যি শিল্প। সমাজের প্রত্যেক সম্প্রদায় ও প্রত্যেক গহস্থই এই শিল্পে নিযুক্ত থাকিত। পরষ, সত্ৰীলোক, বালক, বালিকা সকলেই এই কাজ করিত। নৌকার মাঝি, কৃষক, বেহারা, পরিবারের ভূত্য প্রভৃতি সকলেই অবসর সময়—এই শিপে নিযন্তে করিত। বস্তুতঃ, প্রত্যেক হিন্দ গহস্থই অবসর সময় টাকু হাতে পাটের সন্তা কাটিত। কেবল মুসলমান গহন্থেরা তুলার সন্তা কাটিত। এই পাটের সভ্যতা কাটা ও চট বোনা হিন্দ বিধবাদের একটা প্রধান কাজ ছিল। এই হিন্দ বিধবারা অবজ্ঞাত, উপেক্ষিত, বিনম্র, চিরসহিষ্ণ; আইন তাহাদিগকে চিতার আগণ হইতে রক্ষা করিয়াছে বটে, কিন্তু সমাজ তাহাদিগকে অবশিষ্ট কালের জন্য অভিশপ্ত সন্ন্যাসিনী জীবন যাপন করিতে বাধা করিয়াছে। ষে গহে একদিন সে হয়ত কত্রী ছিল, সেই গহেই এখন সে ক্রীতদাসী। এই পাট শিল্পের কল্যাণেই তাহাদিগকে পরের গলগ্রহ হইতে হইতেছে না। ইহা তাহাদের অন্ন-সংস্থানের প্রধান উপায়। পাট শিলপজাত যে বাংলায় এত অলপ ব্যয়ে প্রস্তুত হয়, এই সমস্ত অবস্থাই তাহার প্রধান কারণ এবং মল্যে সলভ হওয়াতেই বাংলার পাট শিল্পজাত সমস্ত পথিবীর দস্টি আকষণ করিয়াছে।" Wallace: The Romance of Jute. ইহা হইতে বুঝা যাইবে যে, হাতে তৈরী পাট শিল্প বাংলার কৃষক ও গহস্থদের একটি প্রধান গৌণ শিল্প ছিল। ১৮৫০—৫১ সালে কলিকাতা হইতে ২১,৫১,৭৮২ টাকার চট ও বস্তা রপ্তানী হইয়াছিল। বাংলার পাট এখন চাউলের পরেই প্রধান কৃষিজাত পণ্য। কিন্তু বাঙালীদের ব্যবসা বাণিজ্যে ব্যথতা ও অক্ষমতার দরণে, পাট হইতে যে প্রভূত লাভ হয়, তাহার বেশীর ভাগই ইয়োরোপীয়, আমানী বা মাড়োয়ারী বণিকদের উদরে যায়। (৪) প্রকৃত অবস্থা সম্বন্ধে অনভিজ্ঞ একজন বিদেশী পাঠক হয় ত মনে করিতে পারে, ব্যবসায়ীদের এই বিপল লাভের টাকাটা বাঙালীরাই পায়। কিন্তু তাহা সত্য নহে। কেহ কেহ বলিয়া থাকেন যে, পাটের কল কোপানীগুলির অধিকাংশ অংশীদার ভারতবাসী। তাহারা ভারতবাসী বটে, কিন্তু তাহদের মধ্যে অধিকাংশই বাঙালী নয়। অবশ্য, একথা অস্বীকার করা যায় না যে, পাট বিক্লয়ের টাকার একটা প্রধান অংশ কৃষকেরাও পার। যে সব জমিতে পাবে কেবল ধান চাষ হইত, সেই সব জমিতে—বিশেষভাবে ত্রিপরা, ময়মনসিং, (৪) অনুসন্ধানে জানা যায় যে, পাটের মাল্য হইতে প্রায় ১২ই কোটী টাকা এই সব ব্যবসায়ীদের* হাতে যায়।