পাতা:আত্মচরিত (প্রফুল্লচন্দ্র রায়).djvu/৩১১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


তরণেরা জাতীয় ক্ৰীড়া কৌতুকে যোগদান করিত। জন্মাষ্টমী উৎসবে কুস্তাঁ, মদীক্ষা প্রভৃতি হইত, কুন্তীগীরেরা তাহাতে যোগ দিত। অমতবাজার পত্রিকা সেই অতীত গ্রাম্য জীবনের একটি সন্দের বিবরণ লিপিবদ্ধ করিয়াছেন – “ম্যালেরিয়া, কলেরা ও কালাজার গ্রামকে তখন ধবংস করিত না। দারিদ্র্য (বাহার কারণ সাৰদিত) তখন লোককে ককালসার, নিরানন্দ করিয়া তুলিত না। বিদেশী ভাষায় লিখিত পাস্তকের চাপে এবং অসঙ্গত পরীক্ষাপ্রণালীর ফলে, তরুণ বয়কেরা শিশুকাল হইতে এইভাবে নিপেষিত হইত না। প্রত্যেক গ্রামে আখড়া ছিল এবং সেখানে লোকে নিয়মিত ভাবে কুন্তী, লাঠিখেলা, অসিক্ৰীড়া ও ধনবিদ্যা অভ্যাস করিত; অন্যান্য শারীরিক ব্যায়ামও শিখিত। বৎসরে অন্ততঃ দইবার—দগাপজা ও মহরমের সময়—বড় রকমে, খেলাধুলা ও ব্যায়াম প্রদর্শনী হইত। স্মী পর্ষ সকলেই সানন্দে এই উৎসবে দশ করপে যোগদান করিত। আমাদের বড়লোকেরা এখন মোটর গাড়ী ও কুকুরের জন্য জলের মত অথ ব্যয় করিয়া আনন্দলাভ করেন। কিন্তু সেকালে স্বতন্ত্র প্রথা ছিল। বড়লোকেরা পালোয়ান ও কালোয়াতদের পোষণ করা কতব্যজ্ঞান করিতেন। সতরাং পর্বকালে ধনীদের বাসভূমি যে সঙ্গীত ও মল্লবিদ্যার কেন্দ্রস্থান ছিল, ইহা আশ্চষের বিষয় নহে। লোকে কালোয়াত ও পালোয়ানদের ভালবাসিত ও শ্রদ্ধা করিত। । - “বতমানে এই অবস্থার সম্পণে পরিবতন হইয়াছে। পাঞ্জাব এবং যন্তপ্রদেশের কোনকোন অঞ্চল ব্যতীত অন্যত্র পালোয়ানদের সংখ্যা অতি সামান্য। লোকে তাহাদের বড় একটা খাতিরও করে না। বাংলাদেশের অবস্থা আরও শোচনীয়। এখানে লোকের ধারণা যে, পালোয়ানেরা গন্ডা, এবং দারোয়ান শ্রেণীর লোকেরাই ডন বৈঠক কুন্তী প্রভৃতি করিয়া থাকে। সুতরাং বাংলার লোকেরা এরপ অক্ষম ও দ্রবল হইবে এবং যাহারা জোর করিয়া । ཧྥུ་ཧྥུ་ ধনপ্রাণের উপর চড়াও করিবে, তাহাদেরই পদতলে পড়িবে, ইহা কিছই আশ্চর্যের নহে।” বাংলার গ্রামবাসী ধীবরদের মধ্যে, দই একখানি করিয়া “মালকাঠ" থাকিত (১০)। তাহারা মাটী হইতে এগুলিকে উধের্ম তুলিবার জন্য সকলকে বল পরীক্ষায় আহবান করিত। প্রত্যেক গ্রামেই এইরুপ দই একখানি “মালকাঠ” থাকিত। বসন্তাগমে এবং চড়ক উৎসবে যাত্রার (১১) দল গঠিত হইত এবং সঙ্গীত সম্বন্ধে ষাহার একটা জ্ঞান থাকিত, সেই ঐ সব দলে ভতি হইতে পারিত। জাতিধমের ভেদ লোকে এ সময় ভুলিয়া যাইত। ' আমার বেশ স্মরণ আছে,—নিরক্ষর মসলমান কৃষকদেরও এই সব যাত্রার দলে লওয়া হইত। আমার পিতা ভাল বেহালা বাজাইতে পারিতেন। এই সময়ে তিনি গ্রামের ভাল ভাল গায়কদের নিমন্ত্রণ করিয়া পাঠাইতেন। তাঁহার বিচারে যাহাদের গান ভাল উৎরাইত, তাহারা তাঁহার বৈঠকখানায় সসম্মানে স্থান পাইত, এবং সেখানে বসিয়া নিজেদের কৃতিত্ব প্রদর্শন করিত! এখনও সেই বেহালা, সেতার প্রভৃতির সরে যেন আমার কানে ভাসিয়া আসিতেছে। সমরণাতীত কাল হইতে বাংলাদেশে “বার মাসে তের পাবণ” হইত এবং সব প্রধান জাতীয় উৎসব দগোপজার কথা আমার এখনও মনে আছে; দগাপজা যতই নিকটবতী হইত, ততই লোকের মনে কি আনন্দের পন্দন হইত। প্রচুর পরিমাণে মিষ্টান্ন তৈরী হইত এবং গ্রামবাসীদের মধ্যে বিশেষ ভাবে আমাদের প্রজাদের মধ্যে, উহা অকাতরে বিতরণ করা (১০) মল্পকাঠ—বড় একটি গাছের গড়ির খণ্ড বিশেষ। (১১) যারা সম্বন্ধে পাঠক নিশিকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের পুস্তিকা (লণ্ডন, ১৮৮২) দেখিতে পারেন।