পাতা:আত্মচরিত (প্রফুল্লচন্দ্র রায়).djvu/৩৭৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


উঠিতেছে। একটা জাতির সাধারণ লোকেরা যে পরিমাণে মহৎ ও উন্নত হয়, জাতিও ঠিক সেই পরিমাণে মহৎ ও উন্নত হয়।” এই সব দষ্টান্ত হইতে এই মহান শিক্ষা লাভ করা যায় যে, কৃষক, খনির মজর, নাপিত বা মেষপালকের বত্তিতে কোন সামাজিক অমৰ্যাদা নাই। ঐ সব দেশে পরিশ্রম করিয়া সাধভাবে জীবিকাজন সম্মানজনক বিবেচিত হয়, কিন্তু আমাদের দেশে শ্রমের কোন মৰ্যাদা নাই। যাহারা ‘ভদ্রলোক বলিয়া পরিচিত, তাহারা অনাহারে মরিবে তব কারিক শ্রমের কাজ করিবে না,—বরং সামান্য বেতনের কেরাণীগিরিতে সন্তুষ্ট হইবে। অনেক সময় সে আত্মীয়ের গলগ্ৰহ হইয়া পরগাছার মত জীবন ধারণ করিতেও লজিত হয় না। আমাদের চামার, জোলা, তাঁতি, নাপিতেরা আবহমান কাল হইতে সেই একঘেয়ে পৈতৃক ব্যবসা করিয়া আসিতেছে, তাহাদের জীবনে কোন পরিবতন নাই, আনন্দ নাই। আমাদের কতকগুলি শ্রমশিল্পী অপশ্য জাতীয় এবং তাহারা যে ভাবে দিনের পর দিন পৈতৃক ব্যবসা চালায়, তাহাতে তাহাদের অবস্থার উন্নতি হওয়ার কোন সম্ভাবনা নাই। কিন্তু হিন্দ ভারতের বাহিরে, লোকে যে কোন ব্যবসা বা জীবিকা অবলম্বন করিতে পারে, তাহাতে তাহাদের সামাজিক মযাদার হানি হয় না। সমাজের যে কোন স্তরে তাহারা বিবাহ করিতে পারে, এবং এই কারণে তাহারা দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করিয়া বহন বাধা বিপত্তির মধ্যেও জীবনে সাফল্য লাভ করিতে পারে। তিব্বত ও বমর্ণ ভারতের সংলগ্ন,—যথাক্রমে তাহার উত্তর ও পাবে অবস্থিত। বৌদ্ধ ধমের মধ্য দিয়া বাংলা দেশ হইতে তাহারা তাহাদের সভ্যতা লাভ করিয়াছিল। তাহারা জাতিভেদ জানে না এবং তাহাদের সত্ৰীলোকেরা যে সবাধীনতা ভোগ করে তাহা আমেরিকার সত্রীলোকদের পক্ষেও ঈষার বিষয়। চীন দেশও বৌদ্ধ ধমের মধ্য দিয়া বাংলার নিকট তাহার সভ্যতা, সংস্কৃতি, দশন প্রভৃতির জন্য বহল পরিমাণে ঋণী। ইয়োরোপীয় ও আমেরিকান লেখকেরা এক বাক্যে বলিয়াছেন যে, এই চীন দেশে তিন হাজার বৎসরের মধ্যে অপশ্যতা বলিয়া কিছ নাই এবং জগতের মধ্যে এই জাতির ভিতরেই জাতিভেদের প্রভাব সবাপেক্ষা কম। দরিদ্র পিতামাতার সন্তানেরা অতীতে অনেক সময়ই মান্দারিন হইয়াছে। আমাদের মধ্যে যে চামার সে চিরকালচামারই থাকিবে এবং তৃহার সন্তান সন্ততির সমাজে কোন কালে মযাদালাভের সম্ভাবনা নাই। তাহদের স্বাধীন চিন্তার ক্ষমতা এই ভাবে নষ্ট হইয়া গিয়াছে। কৃষক, মেষপালক অথবা খনির মজর অনেক সময় কবি বা ভূতত্ত্ববিদ হইয়া উঠে। যে পারিপাশিবকের মধ্যে সে পালিত হয়, তাহার ফলে তাহার চরিত্রের গুণাবলীর সম্যক বিকাশের সংযোগ ঘটে। আর আমাদের দেশের কৃষক, মেষপালক বা চামার এমন অবস্থার মধ্যে বধিত হয় যে, তাহদের ভবিষ্যৎ উন্নতির কোন আশা নাই। ডাপ্টের ইনফানো-র মত তাহাদের মাটির ঘরের দরজায়ও যেন এই কথাটি লিখিত আছে—“এখানে যে প্রবেশ করিবে, তাহাকে সমস্ত আশা ত্যাগ করিতে হইবে।” যে চোরা বালিতে সে পড়িয়াছে, তাহা হইতে তাহাকে উদ্ধার করিবার কেহ নাই। রবার্ট বানাসের জীবনী হইতে উদ্ধত নিম্নলিখিত ছত্র গলি পড়িলে বঝা যায়, ব্রিটিশ কৃষক ও তাহার পারিবারিক জীবন এবং ভারতীয় কৃষক ও তাহার পারিবারিক জীবনের মধ্যে কি প্রভেদ! স্মরণ রাখিতে হইবে যে, ইহাতে অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্য ভাগের চিত্রই অঙ্কিত হইয়াছে, বৰ্তমান কালে ব্রিটিশ কৃষকের পারিবারিক জীবনের বহর উন্নতি হইয়াছে। “বানসের শিক্ষা তখনও সমাপ্ত হয় নাই, সেই সময়ে তাঁহার কুলে যাওয়া বন্ধ হইল। কটল্যান্ডের কৃষকেরা তাহদের কুটারকেই স্কুলে পরিণত করে; যখন সন্ধ্যা কালে পিতা