বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:আত্মচরিত (প্রফুল্লচন্দ্র রায়).djvu/৯২

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
৫৮
আত্মচরিত

মনে কোন কোন স্থলে বেশ একটু অহমিকার ভাব থাকে। তাহারা মনে করে যে সহকারী বা অধীনস্থদের নিকট হইতে কিছু শিখিতে হইলে তাহাদের জাত যাইবে বা মর্যাদা নষ্ট হইবে। আমার সৌভাগ্যক্রমে এরূপ কোন দৌর্বল্য আমার মনে ছিল না। আমি চন্দ্রভূষণ ভাদুড়ী এবং পেড্‌লারের সহায়তা গ্রহণ করিতে কিছুমাত্র কুণ্ঠিত হইতাম না। এইরূপেই আমি অধ্যাপক জীবন আরম্ভ করিলাম। ক্লাসে কিরূপে নিপুণতার সহিত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করিতে হয়, আমি পুনঃ পুনঃ তাহার মহড়া দিতে লাগিলাম। শীঘ্রই আমি সঙ্কোচের ভাব কাটাইয়া উঠিলাম এবং পরবর্তী সেসন আরম্ভ হইলে দেখিলাম, আমি আমার দায়িত্ব পালনে অপটু নহি।

 লেবরেটরির কাজে এবং ব্যবহারিক ক্লাস চালাইতে আমার অন্যের নিকট শিখিবার বিশেষ কিছু ছিল না। কেননা এ বিষয়ে আমার যথেষ্ট অভিজ্ঞতা ছিল। “হোপ প্রাইজ স্কলার”রূপে অধ্যাপকের সহকারীরূপে আমাকে কাজ করিতে হইয়াছে, ইহা আমি পূর্বেই বলিয়াছি। প্রথম তিনমাস আমাকে খুব পরিশ্রম করিতে হইয়াছিল। কিন্তু তাহাতে আমার আনন্দই হইয়াছিল। ক্লাসে যাইয়া বক্তৃতা করিবার পূর্বে প্রায়ই বক্তৃতার সারমর্ম লিখিয়া লইতাম। এই নূতন কাজে আমার খুব আগ্রহ ও উৎসাহ হইল, কেননা এই কাজ আমার পক্ষে বেশ স্বাভাবিক এবং মনোমত বলিয়া বোধ হইল। আমাদের দেশের যুবকেরা জীবনের বৃত্তি অবলম্বনে অনেক সময় বিষম ভুল করিয়া বসে। যাহা পরে আর সংশোধন করা যায় না। কোনরূপ চিন্তা না করিয়া তাহারা একটা পথ অবলম্বন করে এবং অনেক পরে বুঝিতে পারে যে, তাহারা ভুল পথে গিয়াছে। এই শোচনীয় ব্যাপারের জন্য অভিভাবকরাই বেশী দায়ী, এমারসন একস্থলে যথার্থই বলিয়াছেন যে, অভিভাবকরা তাঁহাদের সাবালক সন্তানদের উপর বেশী রকম মনোযোগ দিয়া তাহাদের ইষ্ট অপেক্ষা অনিষ্টই বেশী করেন। একটা চৌকা ছিদ্রের মধ্যে হাতুড়ী পিটিয়া একটা গোলমুখ পেরেক বসাইতে যে অবস্থা হয়, এ ঠিক সেইরকম। সেসনের প্রথম তিনমাস অর্থাৎ জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের পর পূজার ছুটী আসিল। পেডলার তিন মাসের ছুটী লইয়া বিলাতে গেলেন এবং রসায়ন বিভাগের সমস্ত ভার আমার উপর পড়িল। এক হিসাবে আমার শিক্ষক জীবনে সর্বাপেক্ষা কার্য বহুল সময় এই,—কখনও কখনও আমাকে পর পর তিনটি ক্লাসে বক্তৃতা করিতে হইত। কিন্তু কাজেই ছিল আমার আনন্দ এবং যেহেতু এই কাজে আমি এক নূতন উন্মাদনা বোধ করিলাম, সেইজন্য এই গুরুভার বহন করিতে আমার কোন ক্লান্তি হইল না।

 শিক্ষকরূপে কিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করিলাম। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাসহ বক্তৃতা দেওয়াতেও একটু নৈপুণ্য লাভ করিলাম। এখন আমি অবসর সময়ে গবেষণা কার্য করিতে লাগিলাম। বর্তমান সভ্যতার একটা আনুষঙ্গিক ব্যাধি খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল ক্রমশঃ বাড়িয়া উঠিতেছিল। ঘি এবং সরিষার তেল, বাঙ্গালীর খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে এই দুইটাই বলিতে গেলে কেবল স্নেহ পদার্থ। বাজারে ঘি ও তেল বলিয়া যাহা বিক্রয় হয়, তাহা বিশুদ্ধ নহে। বাজারে বিক্রীত এই সব দ্রব্যে ভেজাল পদার্থ কতটা পরিমাণে আছে তাহা রাসায়নিক বিশ্লেষণ দ্বারা নির্ণয় করা সহজ কাজ নহে।

 আমি এই শ্রেণীর খাদ্যদ্রব্য বিশেষভাবে পরীক্ষা করিতে আরম্ভ করিলাম। বিশ্বাসযোগ্য স্থান হইতে এই সব দ্রব্য সংগ্রহ করিলাম। নিজের তত্ত্বাবধানেও তৈরী করাইয়া লইলাম। দৃষ্টান্ত স্বরূপ, আমার সাক্ষাতে গরু ও মহিষ দোহান হইল এবং সেই দুধ হইতে আমি মাখন তৈরী করিলাম। সরিষা ভাঙাইয়া তেল তৈরী করাইয়া লইলাম, এবং যে সব তেল সরিষার তেলের সঙ্গে ভেজাল দেওয়া হয়, তাহাও সংগ্রহ করিলাম। এদেশের গরুর