পাতা:আনন্দমঠ - বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়.djvu/৮২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


Qbr আনন্দমঠ শান্তি ভয়শূন্ত। একাই স্বদেশের সন্ধানে যাত্রা করিল। সাহসের ও বাহুবলের প্রভাবে নির্বিবঙ্গে চলিল। ভিক্ষা করিয়া অথবা বস্ত ফলের দ্বারা উদর পোষণ করিতে করিতে, এবং অনেক মারামারিতে জয়ী হইয়া, শ্বশুরালয়ে আসিয়া উপস্থিত হইল । দেখিল, শ্বশুর স্বৰ্গারোহণ করিয়াছেন। কিন্তু শ্বাশুড়ী তাহাকে গৃহে স্থান দিলেন না,— জাতি যাইবে । শান্তি বাহির হইয়া গেল । জীবানন্দ বাড়ী ছিলেন । তিনি শান্তির অমুবৰ্ত্তী হইলেন। পথে শাস্তিকে ধরিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি কেন আমার গৃহত্যাগ করিয়া গিয়াছিলে ? এত দিন কোথায় ছিলে ?” শাস্তি সকল সত্য বলিল । জীবানন্দ সত্য মিথ্যা চিনিতে পারিতেন। জীবানন্দ শান্তির কথায় বিশ্বাস করিলেন। অঙ্গরোগণের ভ্ৰবিলাসযুক্ত কটাক্ষের জ্যোতি লইয়া অতি যত্নে নিৰ্ম্মিত যে সম্মোহন শর, পুষ্পধন্থ। তাহা পরিণীত দম্পতির প্রতি অপব্যয় করেন না। ইংরেজ পূর্ণিমার রাত্রে রাজপথে গ্যাস জালে, বাঙ্গালী তেলা মাথায় তেল ঢালিয়া দেয় ; মমুন্যের কথা দূরে থাক, চন্দ্রদেব, সূৰ্য্যদেবের পরেও কখন কখন আকাশে উদিত থাকেন, ইন্দ্র সাগরে বৃষ্টি করেন ; যে সিন্দুকে টাকা ছাপাছাপি, কুবের সেই সিন্দুকেই টাকা লইয়া যান ; যম যার প্রায় সবগুলিকেই গ্রহণ করিয়াছেন, তারই বাকিটিকে লইয়া যান। কেবল রতিপতির এমন নিৰ্ব্বদ্ধির কাজ দেখা যায় না। যেখানে গাঁটছড়া বাধ হইল—সেখানে আর তিনি পরিশ্রম করেন না, প্রজাপতির উপর সকল ভার দিয়া, যাহার হৃদয়শোণিত পান করিতে পারিবেন, তাহার সন্ধানে যান। কিন্তু আজ বোধ হয় পুষ্পধন্বার কোন কাজ ছিল না—হঠাৎ দুইটা ফুলবাণ অপব্যয় করিলেন। একটা আসিয়া জীবানন্দের হৃদয় ভদ করিল—আর একটা আসিয়া শান্তির বুকে পড়িয়া, প্রথম শাস্তিকে জানাইল যে, সে বুক মেয়েমানুষের বুক—বড় নরম জিনিস। নবমেঘনিম্মুক্ত প্রথম জলকণানিষিক্ত পুষ্পকলিকার স্যায়, শান্তি সহসা ফুটিয়া উঠিয়া, উৎফুল্লনয়নে জীবানন্দের মুখপানে চাহিল । জীবানন্দ বলিল, “আমি তোমাকে পরিত্যাগ করিব না। আমি যতক্ষণ না ফিরিয়া আসি, ততক্ষণ তুমি দাড়াইয়া থাক ।” শাস্তি বলিল, “তুমি ফিরিয়া আসিবে ত ?” জীবানন্দ কিছু উত্তর না করিয়া, কোন দিক্‌ না চাহিয়, সেই পথিপাৰ্শ্বস্থ নারিকেলকুঞ্জের ছায়ায় শাস্তির অধরে অধর দিয়া সুধাপান করিলাম মনে করিয়া, প্রস্থান করিলেন।