পাতা:ইন্দিরা-বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়.djvu/১০২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


У зе. ইন্দির ঘরকরনার কাজ করিতে আরম্ভ করিলাম ; যাহাতে র্তাহার আহারের পারিপাট্য, শয়নের পারিপাট্য, স্নানের পারিপাট্য হয়, সৰ্ব্বাংশে যাহাতে ভাল থাকেন, তাহাই করিতে আরম্ভ করিলাম—স্বহস্তে পাক করিলাম ; খড়িকাটি পৰ্য্যন্ত স্বয়ং প্রস্তুত করিয়া রাখিলাম। লজ্জার কথা কহিব কি ?—এক দিন একটু কাদিলাম; কেন ফাদিলাম, তাহা স্পষ্ট তাহাকে জানিতে দিলাম ন—অথচ একটু বুধিতে দিলাম যে অষ্টাহ পরে পাছে বিচ্ছেদ হয়—পাছে তাহার অনুরাগ স্থায়ী না হয়, এই আশঙ্কায় কঁদিতেছি । এক দিন, তাহার একটু অস্থখ হইয়াছিল, সমস্ত রাত্রি জাগরণ করিয়া তাহার শুশ্ৰষা করিলাম। এ সকল পাপাচরণ শুনিয়া আমাকে ঘৃণা করিও না—আমি মুক্তকণ্ঠে বলিতে পারি যে সকলই কৃত্রিম নহে—আমি তাহাকে আস্তরিক ভাল বাসিতে আরম্ভ করিয়াছিলাম। তিনি যে পরিমাণে আমার প্রতি অনুরাগী, তাহার অধিক আমি তাহার প্রতি অমুরাগিণী হইয়াছিলাম। বলা বাহুল্য যে তিনি অষ্টাহ পরে আমাকে মারিয়া তাড়াইয়া দিলেও আমি যাইতাম না। ইহাও বলা বাহুল্য যে তাহার অঙ্কুরাগানলে অপরিমিত ঘৃতাহুতি পড়িতেছিল। তিনি এখন অনন্তকৰ্ম্ম হইয়া কেবল আমার মুখপানে চাহিয়া থাকিতেন। আমি গৃহকৰ্ম্ম করিতাম—তিনি বালকের মত আমার সঙ্গে সঙ্গে বেড়াইতেন। তাহার চিত্তের দুৰ্দ্দমনীয় বেগ প্রতিপদে দেখিতে পাইতাম, অথচ আমার ইঙ্গিতমাত্রে স্থির হইতেন। কখন কখন আমার চরণস্পর্শ করিয়া রোদন করিতেন, বলিতেন, “আমি এ অষ্টাহ তোমার কথা পালন করিব—তুমি আমাক্ষ ত্যাগ করিয়া যাইও না।” ফলে আমি দেখিলাম যে আমি তাহাকে ত্যাগ করিলে তাহার উন্মাদগ্ৰস্ত হওয়া অসম্ভব নহে । পরীক্ষার শেষ দিন আমিও তাহার সঙ্গে কাদিলাম। বলিলাম, "প্রাণাধিক ! আমি তোমার সঙ্গে আসিয়া ভাল করি নাই। তোমাকে বৃথা কষ্ট দিলাম। এখন আমার বিবেচনা হইতেছে, পরীক্ষা মিথ্যা ভ্রম মাত্র। মানুষের মন স্থির নয়। তুমি আট দিন আমাকে ভাল বাসিলে—কিন্তু আট মাস পরে তোমার এ ভালবাসা থাকিবে কি না,তাহা তুমিও বলিতে পার না। তুমি আমায় ত্যাগ করিলে আমার কি দশা হইবে ?” তিনি হাসিয়া উঠিলেন, বলিলেন, “তোমার যদি সেই ভাৰনা হয়, তবে আমি তোমাকে এখনই যাবজ্জীবনের উপায় করিয়া দিতেছি। পূৰ্ব্বেই আমি মনে করিয়াছি, তোমার যাবজ্জীবনের সংস্থান করিয়া দিব ।” আমিও ঐ কথাই পাড়িবার উদ্যোগ করিতেছিলাম ; তিনি আপনি পাড়ায় আরও ভাল হইল । আমি তখন বলিলাম, “ছি! তুমি যদি ত্যাগ করিলে তবে আমি টাকা লইয়া কি করিব ? ভিক্ষা করিয়া খাইলেও জীবন রক্ষা হয়, কিন্তু তুমি ত্যাগ করিলে জীবন রক্ষা হইবে না। তুমি এমন কোন কাজ কয়, যাহাতে আমার বিশ্বাস হয় যে তুমি এজন্মে আমায় ত্যাগ করিবে না। আজ শেষ পরীক্ষার দিন।” তিনি বলিলেন, “কি করিব, বল। তুমি যাহা বলিবে, তাহাই করিব।” আমি বলিলাম “আমি স্ত্রীলোক, কি বলিব ? তুমি আপনি বুঝিয়া কর।” পরে অল্প কথা পাড়িলাম। কথায়ই একটা মিথ্যা গল্প করিলাম। তাহাতে কোন ব্যক্তি আপন উপপত্নীকে সমুদায় সম্পত্তি লিখিয়া মিয়াছিল—এই প্রসঙ্গ ছিল।