জীবনদেবতা
মানুষের ইতিহাসে এমন এক সময় ছিল যখন ভিন্ন ভিন্ন বিদ্যা বিশেষ বিশেষ জাতি বা সম্প্রদায়ের অধিকারের অন্তর্গত ছিল; বংশানুক্রমে তাহারাই সে বিদ্যার চর্চা করিত এবং তাহাকে নিজেদের বিশেষ সম্পত্তি বলিয়া কল্পনা করিত। এখন নাকি গণতন্ত্রের যুগ, এখন সকলেরই সব বিষয়ে অধিকার। সুতরাং ভিন্ন ভিন্ন বিদ্যাকেও প্রত্যেককে প্রত্যেকের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ মেলামেশা করিতে হইতেছে। ধ্যানের অভ্রভেদী শিখরে তাহারা আর অনধিগম্য হইয়া নাই, তাহারা এখন সমতলে নামিয়া আসিয়া ধারার সঙ্গে ধারাকে সম্মিলিত করিবার চেষ্টা করিতেছে। যেখানেই এইরূপ সংগম হইতেছে সেখানেই মানুষ তাহাদের মধ্যে একটি আশ্চর্য অভাবনীয় রূপ দেখিতেছে। সেখানেই তীর্থ, কারণ সেখানে স্বাতন্ত্র্যবোধ লুপ্ত হইয়া ঐক্যবোধ প্রত্যক্ষ প্রকাশমান হইতেছে।
হুইট্ম্যানের একটি কবিতা আছে, তাহার নাম: There was a child went forth everyday— একটি শিশু প্রত্যহ বাহির হইত। কবি বলিতেছেন, সে যাহাই দেখিত তাহাই হইত। প্রভাতের সূর্যোদয়ের অরুণচ্ছটা, পুষ্পের সৌন্দর্য, বিহঙ্গের কাকলি, বৃক্ষলতা, সকল ঋতুর সকল আশ্চর্য দান, ফলশস্যের বিচিত্র সম্ভার, শহরের রাজপথের লোকারণ্য, গৃহের পিতামাতা, আত্মীয়স্বজন, পৌরবর্গ— সকল দৃশ্য, সকল শব্দ, সকল ভাব, সকল অনুভাব তাহার অঙ্গীভূত অংশীভূত হইয়া গিয়াছিল। সে প্রত্যহই এই—সমস্ত গ্রহণ করিত, সে প্রত্যহই বাহির হইত।
কবি—কথিত এই শিশুটি কে? কে বাহির হইয়াছে? আধুনিক মানুষ। যে সব চায়। বিশ্বপ্রকৃতিতে যাহা—কিছু আছে, মানুষের সমাজে যাহাকিছু হইতেছে, সে—সমস্তই ‘আমার’ এই চিহ্নে সে চিহ্নিত করিয়া দিতে চায়। শুধু ‘আমার’ বলিয়া সে ক্ষান্ত নহে; সে—সমস্তই তাহার ‘আমি’,