দুই-তিন মাত্র নৈবেদ্য ও খেয়ার কবিতার অনুবাদ পাঠ করিয়াছিলাম। আমার দু-একজন বন্ধু নৈবেদ্য ও খেয়ার কবিতাগুলিকেই সর্বোত্তম বলাতে আমি বিস্মিত হইয়াছিলাম। জিজ্ঞাসা করাতে তাঁহারা বলিলেন, ‘প্রেমের কবিতা আমাদের দেশে এত জমিয়াছে যে, পাঠকেরা আর তাহাতে স্বদি পায় না। টেনিসন, ব্রাউনিং, জর্জ এলিয়ট প্রভৃতির ‘বস্তুতন্ত্র’ সাহিত্যেও জগৎটা এমনি গায়ে ঘেঁষিয়া দাঁড়াইয়াছে যে, তাহার ‘মায়া’ যেন সূর্যাস্তে মেঘের চতুর্দিকের চঞ্চল বর্ণচ্ছটার মতো আর হিল্লোলিত হইয়া বেড়ায় না—সব যেন বড্ড স্পষ্ট, বড্ড নিরেট, বড্ড বেশি গোচর। আমরা তাই অতীন্দ্রিয় রাজ্যের মোহাঞ্জন চোখে পরিতে চাই; সেই অঞ্জন পরিয়া জগৎকে, মানুষকে, মানুষের প্রেমকে নূতন করিয়া দেখিতে চাই। য়েট্স্ প্রভৃতি কেল্টিক অভ্যুত্থানের কবিদল, ফ্রান্সিস টম্প্সন, জন মেস্ফিল্ড, প্রভৃতি আধুনিক ইংরেজ কবিগণ সেই অঞ্জন চোখে মাখাইয়াছেন বলিয়া পাঠকেরা তাঁহাদের আদর করে। নৈবেদ্য ও খেয়ার কবিতার মধ্যে সেই অতীন্দ্রিয় রাজ্যের অনির্বচনীয় রস আছে―রবীন্দ্রনাথের অন্যান্য কবিতায় সে রস নাই।’
কথাটা তখন আমার মনে লাগিয়াছিল, কিন্তু আধুনিক ইংরেজি কাব্যের সহিত আমার পরিচয় যথেষ্ট ছিল না বলিয়া আমি ভালো করিয়া কথাটা হৃদয়ঙ্গম করিতে পারি নাই। য়েট্সের কাব্য লইয়া পড়িবার চেষ্টা করিয়াছিলাম। য়েট্সের কাব্যের মধ্যে বিশেষত্ব যে কী তাহা বুঝিলাম না। প্রাচীন কেল্ট্ পুরাণকাহিনীকে ছন্দোবদ্ধ করাতেই যদি কোনো বিশেষ বাহাদুরি থাকে তবে সে স্বতন্ত্র কথা। ইংলণ্ডে সবাই বলিত, য়েট্স্ একজন অসাধারণ মিষ্টিক। যাহা-কিছু দুর্বোধ্য ও হেঁয়ালি তাহাকেই মিষ্টিক আখ্যা দেওয়া হয়, ইহাই জানিতাম। এখনকার কালের সাহিত্যে হঠাৎ যে দক্ষিনে হাওয়া মাধবীবনে পুষ্পবিকাশ বন্ধ করিয়া, পুবদেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব করিয়া পুবে হাওয়া হইয়া আকাশকে রহস্যগম্ভীর জলদজালে ঘেরিয়া