বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:কাব্যপরিক্রমা - অজিতকুমার চক্রবর্তী (১৯৫৮).pdf/১০৭

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
১০৬
কাব্যপরিক্রমা

সমাজের ভিতরকার জীবননাট্যলীলাকে তাঁহারা উদ্‌ঘাটন করিয়া দেখাইতেছেন, নয় স্ত্রী-পুরুষের সম্বন্ধ-ঘটিত সংস্কারকে ছিন্ন করিয়া তাহাদের সম্বন্ধের যথার্থ স্বরূপ নির্ণয়ের জন্য চেষ্টা করিতেছেন। কোনো-না-কোনো জায়গায় তাঁহাদের আঘাত আবরণ ছিন্ন করিবার জন্য উদ্যত। সাহিত্যের এই ভিতরের চেষ্টা বাহিরের নিরাভরণ ভাষার ভিতর দিয়া আপনাকে প্রকাশ করিতেছে। সাহিত্যরচনার কোনো আলংকারিক প্রথা বা নিয়ম (conventions) একালের সাহিত্যিকেরা মানেন না। সেইজন্য তাঁহাদের রচনা সময়ে সময়ে এত নেড়া হইয়া পড়ে যে, পড়িয়া কোনো রসই পাওয়া যায় না। কিন্তু তাহার প্রধান কারণ, তাঁহারা অনেকেই নিজেদের সম্বন্ধে অতিসচেতন। আমি একটা কিছু বলিতেছি, আমি এমন করিয়া লিখিয়া থাকি, আমি ভাষার বা সাহিত্যিক প্রথা পদ্ধতির ভারী একটা বদল করিয়া দিতেছি—এ কথা কোনো কবি বা সাহিত্যিক লিখিবার সময়ে ভাবিলেই তাঁহার রচনা কখনোই সরলতার মাধুর্যে ভরিয়া উঠিবে না। অবলীলাক্রমে যে কাজটি হয় তাহাতেই সৌন্দর্য ফোটে। যে গায়ক গানের প্রত্যেক তালটিতে লয়টিতে তানটিতে অত্যন্ত বেশি ঝোঁক দেয়, অর্থাৎ সে সম্বন্ধে সচেতন হয়, তাহার গানের মাধুর্য নষ্ট হইতে বাধ্য। এই জন্য আপনাকে একেবারে ভুলিয়া যখন ভাবের প্রেরণার হাতে কবিরা আপনাদিগকে সমর্পণ করেন তখনই তাঁহাদের সংগীত ফুলের মতো রঙে ও গন্ধে পূর্ণ হইয়া ফোটে, ঢেউয়ের মতো কলক্রন্দনে বাজিতে থাকে, বিশ্বের সকল সৌন্দর্য সকল আনন্দের সঙ্গে একাসন গ্রহণ করে। ইউরোপে আধুনিক কালে একজন কবিও নাই, যিনি এমনি আত্মভোলা সরল। সেই কারণে তাঁহাদিগকে বলিতে হয় এবং তাঁহারাই আপনাদিগকে বলিতে শুরু করিয়াছেন—

তোরা কেউ পারবি নে গো
পারবি নে ফুল ফোটাতে।