সকল সৌন্দর্যের মধ্যে যে অনির্বচনীয় বেদনা, তাহা এই বিরহেরই বেদনা। গ্রহতারার অনিমেষ দৃষ্টির মধ্যে সেই বিরহের চিরব্যাকুলতা মানব-প্রেমের ও বাসনার সকল অতৃপ্তির মধ্যে সেই অনাদি বিরহের বেদনা। এই বিরহই রূপ ধরিতেছে বলিয়া রূপ ক্রমাগতই flowing and changing, বহমান এবং পরিবর্তমান।
গীতিমাল্যের একটি কবিতায় এই মায়ার তত্ত্ব বড়ো চমৎকার করিয়া কবি ব্যক্ত করিয়াছেন—
আমি আমায় করব বড়ো
এই তো আমার মায়া--
তোমার আলো রাঙিয়ে দিয়ে
ফেলব রঙিন ছায়া।
তুমি তোমায় রাখবে দূরে,
ডাকবে তারে নানা সুরে,
আপ্নারই বিরহ তোমার
আমায় নিল কায়া।
কবি বলিতেছেন, এই-যে আমি নিজেকে তাঁহা হইতে স্বতন্ত্র বলিয়া জানিতেছি, ইহাই তো মায়া! কিন্তু এই মায়াটি যদি না থাকিত তবে কি আমাদের কান্নাহাসি আশাভয় এমন নানা রঙে রঞ্জিত হইয়া উঠিত—তবে যে বিচিত্রতার কোথাও কোনো স্থানই থাকিত না। এই তাঁতে-আমাতে যে আড়াল রহিয়াছে, তাহাতেই তো ‘দিবানিশির তুলি দিয়ে হাজার ছবি আঁকা’ হইতেছে। এই মায়ার পর্দাখানি না থাকিলে কি এত রঙ, এত আঁকাবাঁকা কিছুই থাকিত—বর্ণ ও আকার লোপ পাইয়া সমস্তই একমাত্র অখণ্ড এক হইয়া যাইত না? ভাগ্যে এই মায়া ছিল, নহিলে ঈশ্বরেরই বা আপনাতে আপনি থাকিয়া কী আনন্দ ছিল, এবং আমাদেরই বা অহংকার বিলুপ্ত হইয়া তুরীয় অবস্থা প্রাপ্ত হইয়া কী আনন্দ ছিল?