মাত্র দৃশ্য এবং অদৃশ্য জগতের মাঝখানের পর্দাটি তুলিয়া ধরা হইত এবং এই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের উপরে সেই অতীন্দ্রিয় জগতের অপরূপ আলো পড়িয়া সকল রূপরস সকল শব্দগন্ধকে যে কী অনির্বচনীয় বেদনায় ঝংকৃত করিয়া তোলে যদি গানে কবি তাহারই আভাসমাত্র দিতেন—তবে কাব্য হিসাবে ইহা অতুলনীয় হইত সন্দেহ নাই। কিন্তু গীতাঞ্জলিতে শুধু উপলব্ধির কথা তো নাই—কেমন করিয়া সেই উপলব্ধি সম্ভাবনীয় হইল তাহার সাধনার ইতিবৃত্তও আছে। কাব্য হিসাবে এই সাধনার-ইঙ্গিত-সম্বলিত কবিতাগুলি নিকৃষ্ট—ফরাসী গীতাঞ্জলির ভূমিকায় কবি Andre Gide এইরূপ কোনো কোনো কবিতাকে ‘নৈতিক’ কবিতা বলিয়াছেন দেখিলাম।
ইংরেজি গীতাঞ্জলি, নৈবেদ্য হইতে গীতিমাল্য পর্যন্ত সমস্ত কাব্যগুলি হইতে অবচিত শ্রেষ্ঠ কবিতাপুষ্পের সাজি, সুতরাং তাহার কোনো কোনো কবিতা সম্বন্ধেই যদি Gide’এর এ কথা মনে উদয় হইয়া থাকে তবে কেবলমাত্র বাংলা গীতাঞ্জলি পাঠ করিলে এ কথা তাঁহার পুনঃপুনই মনে হইত। বাংলা গীতাঞ্জলির গানগুলিতে কবির অধ্যাত্মসাধনার বার্তার ভাগই বেশি, পরিপূর্ণ উপলব্ধির বাণীর ভাগ কম।
বাংলা গীতাঞ্জলির যে-সকল গানে কবির অধ্যাত্মসাধনার আভাস-ইঙ্গিত আছে সেগুলি পরে পরে সাজাইলে কবির সাধনার একটি সুস্পষ্ট চেহারা ধরিতে পারা যায়। মোটামুটি সাধনার তিনটি ধারা আমি ধরিতে পারিয়াছি; যথা:
১ সংসারের দুঃখ-আঘাত-বেদনার একটি বিশেষ সার্থকতা আছে। ইহারা তাঁহার ‘দূতী’; তিনি যে আমাদের জন্য অভিসারে বাহির হইয়াছেন ইহারাই সেই সংবাদ জানায়। আমাদের চিত্ত যখন অসাড় থাকে তখন এই দুঃখ-আঘাতই তো তাঁহার স্পর্শ, তিনিই আমাদের জাগাইয়া দেন। ধূপকে না পোড়াইলে সে যেমন গন্ধ দেয় না, দুঃখের