বাংলা গীতাঞ্জলিতে কবির সাধনার ধারার এইরূপ সুস্পষ্ট চেহারা দেখিতে পাওয়া যায় বলিয়া গীতাঞ্জলিতে যে-সকল কবিতায় সাধনার সফলতার মূর্তি পরিস্ফুট হইয়াছে, তাহারা যে কত সত্য তাহা হৃদয়ঙ্গম করা যায়।
কিন্তু সচরাচর আর্টিস্টের কাছে আমরা তাঁহার সাধনার শ্রেষ্ঠ ফলটাই পাই, কেমন করিয়া সে ফল ফলিল সে সংবাদ চাপা থাকে। কারণ, পাকশালায় রন্ধনের সামগ্রী যখন স্তূপীকৃত তখন তাহাতে কোনো আনন্দ নাই; কিন্তু যখন অন্নব্যঞ্জন প্রস্তুত হইয়া দেখা দেয় তখনই ভোজের প্রকৃত আনন্দ। গীতাঞ্জলির এই সাধনার কবিতাগুলি কবিতা হিসাবে উৎকৃষ্ট নহে সে বিষয়ে সন্দেহ নাই, কিন্তু ইহাই আশ্চর্য যে কবির সমস্ত স্বরূপটি কেমন সহজে কেমন অনায়াসে এই কাব্যের মধ্যে ধরা দিয়াছে। এ যেন কবির প্রতিদিনের ডায়ারি—শুধু প্রভেদ এই যে, মানুষ ডায়ারি লিখিবার কালে প্রায়ই আপনার সম্বন্ধে কিছু-না-কিছু সচেতন না হইয়া পারে না, এই কাব্যে কবির অজ্ঞাতসারে তাঁহার হৃদয়ের অন্তরতম অভিজ্ঞতাগুলি পরে পরে বাহির হইয়া আসিয়াছে। বিশ্বপ্রকৃতির সৌন্দর্যের স্পর্শে তাঁহার অপূর্ব পুলক, তাঁহার অপেক্ষা ও আশা, আপনার সঙ্গে আপনার দ্বন্দ্ব, প্রবল দুঃখ ও আঘাতের মধ্য দিয়া কেবলই জাগরণ, তাঁহার সুদূর পরিণামের দৃষ্টি—সমস্তই স্তরে স্তরে পত্রে পত্রে ধরা পড়িয়া গিয়াছে। শিল্পীর মতো কেবল শিল্পের শ্রেষ্ঠ ফল দান করিয়া কবি বিদায় লন নাই, তিনি এই কাব্যে আপনাকে সম্পূর্ণ করিয়া দান করিয়াছেন। এইখানেই গীতাঞ্জলির বিশেষত্ব। এই বিশেষত্বের জন্যই পশ্চিমে এই শ্রেণীর অন্যান্য সকল কাব্যের অপেক্ষা গীতাঞ্জলির সমাদর এত অধিক হইয়াছে। এই কাব্যে মানুষের জীবনের মধ্যে কবির সাধনা গিয়া আঘাত করিতেছে। আমার যতদূর মনে পড়ে, ইংরেজি গীতাঞ্জলি সম্বন্ধে একখানি পত্রে প্রবীণ সাহিত্যিক স্টপ্ফোর্ড্ ব্রুক এই কথাটিই বলিয়াছিলেন।