কিন্তু কবির অধ্যাত্মসাধনার কথা মানুষের যতই উপকার সাধন করুক, তাহা সেই ‘আঘাত করা বোঁটাতে’, তাহা ‘ফুল ফোটানো’ নহে। একজনের সাধনা আর একজনের জীবনকে সাহায্য করিতে পারে বটে, কিন্তু সাধনা নিজেই যখন কূলে উত্তীর্ণ হয় নাই তখন তাহার উপর নির্ভর করিতে গেলে, যে ব্যক্তি নির্ভর দেয় এবং যে ব্যক্তি নির্ভর করে উভয়কেই ডুবিতে হয়। সকল দেশেই গুরুবাদ এইজন্য অন্ধ অনুকরণেরই সৃষ্টি করিয়াছে। কারণ, কোনো একজন মানুষের পন্থা আর-একজনের পন্থার সমান নহে। যে যে-পন্থা দিয়াই যাউক, গম্যস্থানে পৌঁছিয়া সেখানকার কথা বলিলে আর ভয় নাই, কারণ সেখানকার আনন্দের হিল্লোল তখন সকল বিচিত্র পথের মধ্যেই সমান হিল্লোলিত হইবে। আমাদের দেশের লোক সাধনার বিচিত্রতাকে, ‘varieties of religious experience’কে, উইলিয়ম জেম্সের মতো বৈজ্ঞানিকভাবে বুঝিতে পারুক আর নাই পারুক, একটি বিষয়ে এ দেশের লোকের বোধ সুপরিণত হইয়াছে। অধ্যাত্মসাধনার ফলটিতে ঠিক পাক ধরিল কি না তাহা আমরা বিলক্ষণ বুঝি। কথায় আমাদের চিঁড়া ভিজাইতে পারে না। আমাদের দেশের লোক শ্রুতিধারণের মতো করিয়া যে সকল ভক্তদের বাণী ও সংগীত রক্ষা করিয়া আসিয়াছে তাহা শ্রবণমাত্র আমরা এ বিষয়ে আমাদের জাতির প্রতিভা বুঝিতে পারিব। ভক্তির সঙ্গে ভেক এ দেশে মিশিয়া আছে সত্য; কিন্তু কালের চালুনিতে ভেকের রচনা তলায় থিতাইতেছে কই?
আমরা রবীন্দ্রনাথের সমস্ত জীবনবৃক্ষের পরিণামের দিকে চাহিয়া আছি; একটা গীতাঞ্জলিকেই আমরা সেই জীবনমহাবৃক্ষের পরিণত ফল বলিতে যাইব কেন? গীতাঞ্জলিকে পশ্চিম বেশি বুঝিয়াছে এ কথা তাহারা গর্ব করিয়া উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করিলেও আমরা তাহা সত্য নয় জানি। যথার্থ বোধ জনসংখ্যার আধিক্যের উপর নির্ভর করে না। পৃথিবীর