বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:কাব্যপরিক্রমা - অজিতকুমার চক্রবর্তী (১৯৫৮).pdf/১২

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
জীবনদেবতা
১১

তত্ত্বকে চায় না, অনির্বচনীয়কে চায়। এইজন্যই, সে যে রসরূপের সৃষ্টি করে তাহার মধ্য হইতে তাহার আসল ভাবটা কী তাহা উদ্ধার করা এত কঠিন হয়। মুখের মধ্যে যেমন মনের নানা ভাবের আলোছায়াপাত দেখা যায়, কবিতার মধ্যে তেমনি ভাবের নানা ইশারা ইঙ্গিত মাত্র দেখা যায়, কিন্তু তার বেশি নয়। সুতরাং দর্শন—বিজ্ঞানের সঙ্গে তাহাকে মিলাইতে গেলে অত্যন্ত অসংগত একটি কাণ্ড ঘটে।

 এ—সকল কথা মানিয়া লইলেও বলিতে হয় যে, কবিতার মধ্যেও সত্য আছে, সে যে কেবলই মায়ার সৃষ্টি তাহা নহে। আমাদের মনের নানান মহালে যে সত্যের নূতন নূতন রূপ। কোনোটা বা মস্তিষ্কের মহাল, কোনোটা বা হৃদয়ের মহাল, কিন্তু এই বিচিত্রতায় সত্য কিছু বিভিন্ন হইয়া যান না। ইশারায় বলিলেও সত্য, কূটতর্কের জালে আচ্ছন্ন করিয়া বলিলেও সত্য, প্রমাণপ্রয়োগের দ্বারা যন্ত্র দ্বারা দেখাইলেও সত্য। জগতের রূপ কেবলমাত্র ইন্দ্রিয়ের সৃষ্টি, সুতরাং তাহা মিথ্যা, জগতের বাস্তবিক সত্তার মধ্যে রূপের কোনো সদ্ভাব নাই— এ কথা যত বড়ো দার্শনিকই বলুন না কেন, ইহা সত্য নয়। কারণ, রূপ শুধু চোখে দেখিবার ও ইন্দ্রিয় দিয়া অনুভব করিবার জিনিস হইলে মানুষ কখনোই বলিত না ‘জনম অবধি হম রূপ নেহারনু, নয়ন না তিরপিত ভেল।’ রূপের মধ্যেই যে অরূপের বাসা, সে যে ভিতরেরই বাহির, সত্তারই প্রকাশ। কবিতা শুধুই প্রকাশ, আর কিছুই নয়, এ কথা তেমনিই সত্য নহে— কারণ, কবিতাও সত্যেরই প্রকাশ। সুতরাং ‘জীবনদেবতা’র আইডিয়ার সঙ্গে যদি দর্শনবিজ্ঞানের কোনো তত্ত্বের সাদৃশ্য দেখা যায় তবে ইহাই বলিব যে, এ আইডিয়াটি সত্য, এ নিছক কল্পনা নয়। কবি এই সত্যকে অনুভূতির দিক হইতে উপলব্ধি করিয়াছেন, প্রমাণ সংগ্রহ করিবার জন্য ব্যস্ত হন নাই। তিনি ইঙ্গিত করিয়াই ক্ষান্ত হইয়াছেন, তত্ত্ব গড়েন নাই।