কোনো কবিকেই বহু লোকে বুঝে নাই। আমরা যে কবিকে তাঁহার সমগ্র কাব্যজীবনের ভিতর হইতে দেখিতেছি, তাঁহার জীবনের পশ্চাতে যে বহুযুগের অধ্যাত্মরসধারা তাঁহাকে পরিপুষ্ট করিতেছে তাহাকে দেখিতেছি—কিছুই আমাদের কাছে ঝাপসা নহে। আমরা জানি, তাঁহার প্রাণের মূল জীবনের সুখদুঃখময় সকল বিচিত্র রসের মধ্যে কত দূরে গভীরতম তন্তুতে আপনাকে প্রেরণ করিয়াছে এবং সমস্ত বিশ্বের আলোকে সমীরণে নানা আঘাতে বিকাশ লাভ করিয়া দিকে দিকে সেই বিচিত্র জীবনের রসপুষ্ট কাব্যের শাখাপ্রশাখা কী আশ্চর্য পত্রপুষ্পে শোভিত হইয়া আপনাকে প্রসারিত করিয়া দিয়াছে। ক্রমে যখন শাখাগ্রভাগে পরিণত জীবনের ফল ধরিল তখন তাহার কাঁচা রঙ আমরা দেখিয়াছি—তখনও তাহা রসে মধুর হয় নাই, জীবনের ভোগের বৃন্তে তাহার জোড় দৃঢ়বদ্ধ। ক্রমে ভিতরে ভিতরে রসে যখন সে পূর্ণ হইতে লাগিল, তাহার ভিতরের সেই পূর্ণতা তাহার বাহিরে আত্মদানরূপে অত্যন্ত অনায়াসে যখন প্রকাশ পাইল, তাহার পুষ্পদল ছিন্ন হইয়া তাহার ভোগের বৃত্ত শিথিল হইল—তখন তাহার সেই বিশ্বের কাছে নিবেদিত অঞ্জলিকে আমরা যে চিনি নাই এ কথা স্বীকার করি না। কিন্তু সেই অঞ্জলিকেই সম্পূর্ণ বলিতে যাইব কেন? সে তো রসের ভারে একেবারে অবনত হয় নাই—তাহার রসের কথার চেয়ে তাহার সাধনার কথা, তাহার বেদনার কথা যে অধিক। এই নবপ্রকাশিত গীতিমাল্যের গানগুলি রসে টুস্টুসে ফলের মতো—স্পর্শমাত্রেই যেন ফাটিয়া পড়িবে। ইহার মধ্যে সাধনার বিশেষ কোনো বার্তাই নাই—সেইজন্য বেদনার মেঘমলিনিমা নাই, আগাগোড়া আনন্দের জ্যোতির্ময় উচ্ছ্বাস। গীতাঞ্জলি এবং গীতিমাল্য এই দুই নামের মধ্যেই দুই কাব্যের পার্থক্য দিব্য সূচিত হইয়াছে। গীতাঞ্জলি যেন দেবতার পায়ে সসম্ভ্রমে গীতিনিবেদন, সেখানে—
পাতা:কাব্যপরিক্রমা - অজিতকুমার চক্রবর্তী (১৯৫৮).pdf/১২০
অবয়ব
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
গীতাঞ্জলি
১১৯