লোকেরও মনে এ বিশ্বাস নাই। ভারতবর্ষে বৈষ্ণব ভক্তিবাদের উৎপত্তি অনুসন্ধান করিতে গিয়া ইঁহারা বলেন যে, ভারতবর্ষের দক্ষিণ অঞ্চলে খৃস্টান মিশনারিগণ আসিয়াছিলেন, তাঁহাদের নিকট হইতে বাইবেলের ভক্তিবাদ শ্রবণ করিয়া এ দেশে বৈষ্ণবধর্মের অভ্যুদয় ঘটে। কবীরের বাক্যাবলীর মধ্যে এক জায়গায় আছে যে, শব্দ হইতে সমস্তের উৎপত্তি, সকলের আদিতে শব্দ ছিল—তাহা পাঠ করিয়া কোনো বিখ্যাত ইংরেজ বিদুষীর মনে হইয়াছিল যে, কবীর সেণ্ট্ জনের সুসমাচার হইতে নিশ্চয়ই ঐ ভাবটি ধার করিয়াছেন!
যে ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের অন্যান্য কাব্যগ্রন্থ পাঠ করিয়াছে, রবীন্দ্রনাথকে খৃস্টান ভক্তকবিদের সঙ্গে তুলনা করা তাহার পক্ষে অসম্ভব। খৃস্টান ধর্ম ভক্তিধর্ম হইলেও প্রাচীন হিব্রুধর্মের বহু সংস্কারকে সম্পূর্ণরূপে ছাড়াইয়া উঠিতে পারে নাই। এই জগৎ যে জগদীশ্বরের দ্বারা আবাস্য নহে, তিনি যে সর্বভূতান্তরাত্মারূপে ইহার অন্তরতর স্থানে প্রতিষ্ঠিত নাই—হিব্রুধর্মের ইহা এক মূল কথা। জগৎপতি থাকেন এক কল্পিত স্বর্গলোকে। এবং এই জগৎ-যন্ত্র তাঁহার হস্তের দ্বারা নির্মিত হইলেও তাঁহা হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া পাপী মনুষ্যের আবাসস্থান হইয়া আছে। যদিচ খৃস্ট মানুষকে উদ্ধার করিবার জন্য এবং স্বর্গে পুনরায় লইয়া যাইবার জন্য পৃথিবীতে মানবরূপ পরিগ্রহ করিয়া অবতীর্ণ হইয়াছিলেন তথাপি স্বর্গ এবং মর্তের ব্যবধান তাঁহার দ্বারা দূরীভূত হয় নাই। তিনি মধ্যস্থতা করিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন এবং স্বর্গ হইতে অবতরণ করিবার জন্য পৃথিবীতে তাঁহাকে ক্রুশের ব্যথা বহন করিতে হইয়াছিল। সেই ক্রুশ তাঁহার সকল ভক্তের জন্য তিনি রাখিয়া গিয়াছেন—সেই পরম দুঃখ-স্বীকারের উপর স্বর্গের অধিকারলাভের সম্ভাবনা নির্ভর করিতেছে। মানবের নিকটে ঈশ্বরের আত্মদান আনন্দের আত্মদান নহে, দুঃখের বলিদান—এই তত্ত্ব কোথায়, আর কোথায় উপনিষদের ‘আনন্দাদ্ধোব খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে’,