আনন্দ হইতে সকল সৃষ্টির উদ্ভব—এই তত্ত্ব! আমাদের শাস্ত্রে বলে জগতের সঙ্গে ঈশ্বরের, আনন্দের একাত্মযোগ, জগৎ ঈশ্বরের আনন্দের দ্বারা পরিপূর্ণ। জগৎ সসীম, ঈশ্বর অসীম, কিন্তু সসীমের মধ্যে অসীমের প্রকাশ। এই জগৎ তাহার আনন্দরূপ, অমৃতরূপ—আনন্দরূপমমৃতং যদ্বিভাতি। এ তত্ত্ব খৃস্টান ধর্মশাস্ত্রে কুত্রাপি পরিলক্ষিত হয় না। সেইজন্য সসীম অসীমের দ্বন্দ্ব সে দেশের ধর্মশাস্ত্রে কিছুতেই নিরস্ত হইবার নহে।
রবীন্দ্রনাথ আবাল্য উপনিষদের স্তন্যরসে পরিপুষ্ট ও বর্ধিত—খৃষ্টীয় স্বর্গমর্তের কল্পিত ব্যবধানের তত্ত্ব, মনুষ্যের আদিম পাপের তত্ত্ব এবং খৃস্টের আত্মবলিদানের দ্বারা সেই পাপ হইতে উদ্ধারের তত্ত্ব তাঁহার কাছে অত্যন্ত স্থূল ও ভ্রান্ত ভিন্ন আর কী প্রতিপন্ন হইতে পারে? সেইজন্য তাঁহাকে সেণ্ট্ ফ্রান্সিস অব অ্যাসিসি বা ঐ শ্রেণীর খৃষ্টীয় সাধকদিগের সঙ্গে তুলনা করা নিতান্ত অসংগত হইয়াছে। উপনিষদের সঙ্গে বাইবেলের যেমন তুলনা চলে না, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ফ্রান্সিস অব অ্যাসিসি বা মঠাশ্রয়ী খৃষ্টীয় কোনো সাধকের তেমনি তুলনা চলে না।
আমি অবশ্য ভুলি নাই যে, গ্রীক দার্শনিক প্লেটো ও প্লাটিনাসের ভাববাদ যেখানেই খৃষ্টধর্মের সঙ্গে তত্ত্বে এবং সাধনায় মিলিত হইবার সুযোগ লাভ করিয়াছে সেখানেই খৃস্টান ধর্মতত্ত্ব এবং সাধনা এমন একটি অভাবনীয় রূপ লাভ করিয়াছে যাহা বাস্তবিকই বিস্ময় উদ্রেক না করিয়া পারে না। খৃস্টধর্মে ঈশ্বরের সসীম ও অসীম স্বরূপের যে দ্বন্দ্ব রহিয়াছে—ঈশ্বর তাঁহার শক্তিতে অনন্ত কিন্তু প্রেমে সান্ত, এই-যে তাঁহার দ্বৈত খৃষ্টধর্ম স্বীকার করিয়াছে—ইহাকে অবলম্বন করিয়া এক নিগূঢ় তত্ত্বের উদ্ভব জর্মান দেশে ঘটিয়াছে। জেকব বইমে, এই তত্ত্বের একজন প্রধান প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যাখ্যাতা। জেকব বইমে, রুইজব্রুয়েক প্রভৃতি কোনো কোনো সাধকের সহিত আমাদের প্রাচ্য ভক্তিসাধক দিগের সৌসাদৃশ্য এইজন্য দেখা যায়। কিন্তু মোটের উপর খৃস্টীয় সাধনা বলিতে উৎকট পাপবোধ ও তজ্জনিত