বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:কাব্যপরিক্রমা - অজিতকুমার চক্রবর্তী (১৯৫৮).pdf/১২৫

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
১২৪
কাব্যপরিক্রমা

ব্যাকুলতা এবং মানবরূপী ভগবান খৃষ্টের অনন্যশরণাগতির চিত্রই মনে জাগে। তাহার সঙ্গে ভারতবর্ষীয় সাধনার সম্বন্ধ বড়োই অল্প।

 উপনিষদের স্তন্যরসে রবীন্দ্রনাথ বর্ধিত হইয়াছেন এবং তাঁহার কাব্যের মর্মস্থলে উপনিষদের তত্ত্ব বিরাজমান এ কথা বলিলেও, কেবলমাত্র উপনিষদ গীতিমাল্যের গানগুলির উৎস হইতে পারিত না। উপনিষদের শ্রেষ্ঠ ভাব আত্মাতে পরমাত্মাকে দর্শন। শান্ত দান্ত উপরত তিতিক্ষু সমাহিত হইয়া সাধক ‘আত্মন্যেবাত্মানং পশ্যতি’, আত্মার মধ্যে সেই পরমাত্মাকে দেখিয়া থাকেন। সজ্ঞানপ্রসাদেন বিশুদ্ধসত্ত্বস্ততাস্তু তং পশ্যতে নিষ্কলং ধ্যায়মানঃ―জ্ঞানপ্রসাদে বিশুদ্ধসত্ত্ব হইলে ধ্যায়মান হইয়া মানুষ তাঁহাকে দেখিতে পায়। উপনিষদ যেখানে সর্বভূতের মধ্যে আত্মাকে দেখিবার কথা বলিয়াছেন সেখানেও আত্মস্থ হইয়া যোগস্থ হইয়া ‘নিত্যোঽনিত্যানাং’ সকল অনিত্যের মধ্যে তাঁহাকে নিত্যরূপে ধ্যান করিবার উপদেশই দিয়াছেন। উপনিষদের সাধনা এই অন্তর্মুখীন ধ্যানপরায়ণ সাধনা, অধ্যাত্মযোগের সাধনা। উপনিষদের ব্রহ্ম—দুর্দর্শং গূঢ়মনুপ্রবিষ্টং গুহাহিতং। তিনি লীলারসময় বিশ্বরূপ ভগবান নহেন। বৈষ্ণবের লীলাতত্ত্বের আভাস উপনিষদের মধ্যে নানা স্থানে থাকিতে পারে, কিন্তু সেই তত্ত্ব উপনিষদের মধ্যে পরিস্ফুট আকার লাভ করিয়াছে এ কথা কোনো মতেই বলা যায় না। লীলাতত্ত্বের কথা এই যে, বিশ্বের সকল সৌন্দর্য, সকল বস্তু, সকল বৈচিত্র্য, মানবজীবনের সকল ঘটনা, সকল উত্থানপতন সুখদুঃখ জন্মমৃত্যু—সমস্তই শ্রীভগবানের রসলীলা বলিয়া গভীরভাবে উপলব্ধি করিতে হইবে। ভগবান অনাদি অনন্ত নির্বিকল্প হইয়াও প্রেমে অন্তের মধ্যে ধরা দিয়াছেন, সেইজন্যই তো কোথাও অন্তের আর অন্ত পাওয়া যায় না। ‘সীমার মাঝে, অসীম, তুমি বাজাও আপন সুর।’ সকল সীমাকে রন্ধ্র করিয়া সেই অনন্তের বাঁশি তাই নিরন্তর বাজিতেছে এবং তিনি বারবার জীবনের নানা গোপন নিগূঢ় পথ দিয়া