আমাদিগকে তাঁহার দিকে কত দুঃখক্লেশ কত আঘাত অভিঘাতের ভিতর দিয়া আকর্ষণ করিয়া লইয়া চলিয়াছেন। সমস্ত জীবনের এই সুখদুঃখবিচিত্র পথ তাঁহারই অভিসারের পথ। এই পথেই তাঁহার সঙ্গে আমাদের মিলন; এই পথেই কত বিচিত্র রূপ ধরিয়া তিনি দেখা দিতেছেন। এই-যে বিশ্ব ও মানবজীবনের সকল বৈচিত্র্যকে ভগবানের প্রেমের লীলা বলিয়া অনুভূতি, বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্বের ইহাই সার কথা।
উপনিষদের যোগতত্বে বেদান্তশাস্ত্র তৈরি হইতে পারে, কিন্তু তাহা হইতে কাব্যকলা সমুৎসারিত হয় না। বৈষ্ণবের লীলাতত্ত্বে অনুভূতির বিচিত্রতা ও প্রসার এমন বাড়িয়া যায় যে, কাব্যকলাকে আশ্রয় করিয়া তাহা আত্মপ্রকাশ না করিয়া থাকিতে পারে না। এইজন্য উপনিষদ হইতে আমরা দর্শনশাস্ত্র পাইয়াছি; কিন্তু বৈষ্ণব ভক্তিবাদ হইতে কেবল দর্শনশাস্ত্র নহে, অপূর্ব ভক্তিকাব্যসকলও সম্ভাবিত হইয়াছে। কেবল বাংলাদেশের বৈষ্ণব কবিতার কথা বলিতেছি না, উত্তর-পশ্চিমের কাব্য ও গানগুলিও সংখ্যায় বৈচিত্র্যে এবং রসগভীরতায় বাংলার বৈষ্ণব কাব্যের চেয়ে কোনো অংশে ন্যূন নহে, বরং অনেক বিষয়ে শ্রেষ্ঠ। আমরা সেসকল কাব্য ও গানের কত অল্প পরিচয় পাইয়াছি। জ্ঞানদাস রবিদাস কবীর দাদূ মীরাবাঈ প্রভৃতি ভক্তকবিদের গানের যে দু-একটা টুকরা কালের স্রোতে এখনকার ঘাটে আসিয়া লাগিয়াছে তাহা শতদলের ছিন্ন পল্লবের মতো সুগন্ধে প্রাণকে বিধুর করিয়া দেয়। মানুষের অন্তরের ভক্তি যখন তাহার অনুরূপ ভাষা লাভ করিয়া আপনাকে ব্যক্ত করে তখন সে যে কী অপূর্ব জিনিস হয় তাহা এই উত্তর-পশ্চিমের ভক্তিসাহিত্যে পরিষ্কার দেখিতে পাওয়া যায়।
রবীন্দ্রনাথ কেবলমাত্র উপনিষদের অধ্যাত্মযোগতত্ত্বের দ্বারা অনুপ্রাণিত নন এবং কেবলমাত্র বৈষ্ণবের লীলাতত্ত্বের দ্বারাও অনুপ্রাণিত নন, এই দুই তত্ত্বই তাঁহার জীবনের সাধনায় জৈব মিলনে মিলিত হইয়া এক অপরূপ