বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:কাব্যপরিক্রমা - অজিতকুমার চক্রবর্তী (১৯৫৮).pdf/১২৭

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
১২৬
কাব্যপরিক্রমা

নূতন রূপ পরিগ্রহ করিয়াছে। তাঁহার ভক্তিকাব্যের এই নবরূপকে বিশ্লেষণ করিয়া, তাহার কী পরিমাণ অংশ উপনিষদের এবং কী পরিমাণ অংশ বৈষ্ণব ভক্তিতত্ত্বের তাহা নির্দেশ করতে যাওয়া ব্যর্থ চেষ্টা মাত্র। কারণ, এ তো দর্শনশাস্ত্র নয়, এ যে জীবনের জিনিস। এ গান যে জীবন হইতে প্রতিফলিত হইতেছে। সে জীবন আপনার অধ্যাত্মপিপাসায় কোনো রসকেই বাদ দেয় নাই, তাহার মধ্যে সকল বিচিত্র রস মিলিয়া-জুলিয়া এক অভিনব মূর্তি গ্রহণ করিয়াছে। সেইজন্য বৈষ্ণবকাব্যের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি বা গীতিমাল্যের তুলনাই চলে না। ঐ কাব্য দুটির মধ্যে যে বৈষ্ণবভাব বহুলপরিমাণে নাই এমন কথা বলি না; কিন্তু আরও অনেক জিনিস আছে যাহা বৈষ্ণবভাব নয়, যাহা বৈষ্ণবভাবাবলীর সঙ্গে সংগত হইয়া তাহাদিগকে রূপান্তরিত করিয়া ফেলিয়াছে।

 আরও একটি কারণে রবীন্দ্রনাথকে ভারতবর্ষের প্রাচীন বৈষ্ণব বা ভক্তকবিদিগের সঙ্গে তুলনা করা চলে না। কেবল যে রবীন্দ্রনাথের মধ্যেই উপনিষদের অধ্যাত্মযোগতত্ত্ব এবং বৈষ্ণব লীলাতত্ত্ব মিলিয়াছে এবং বাণীরূপ লাভ করিয়াছে তাহা নহে, কবীর দাদূ প্রভৃতির মধ্যেও এই একই প্রক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। সুফিধর্ম, বেদান্ত এবং বৈষ্ণব ভক্তিবাদ এই ত্রিবেণীসংগমের তীর্থোদকে কবীরের অমর সংগীত অভিষিক্ত হইয়াছে। সেইজন্য তাহার অন্তরে যেমন কঠিন একটি তত্ত্বজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাধার, তাহার উপরে তেমনি ভক্তির রসোচ্ছ্বাস সংগীতের তরল ধারায় নৃত্য করিয়া চলিয়াছে। কিন্তু তথাপি সেই-সকল গানের সহিত গীতিমাল্যের গানের রূপভেদ আছে। গীতিমাল্য ও গীতাঞ্জলির রবীন্দ্রনাথ যে ‘সোনার তরী’ ‘চিত্রা’ ‘কল্পনা’ ‘ক্ষণিকার’ও রবীন্দ্রনাথ; যিনি প্রকৃতির কবি, মানবপ্রেমের কবি, যিনি সকল বিচিত্র রসনিগূঢ় জীবনের গান গাহিয়াছেন, তিনিই যে এখন ‘রসানাং রসতমঃ’, সকল রসের রসতম ভগবৎ-প্রেমের গান গাহিতেছেন—ইহাতেই ভারতবর্ষের ও অন্যান্য দেশের ভক্তিসংগীতের