বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:কাব্যপরিক্রমা - অজিতকুমার চক্রবর্তী (১৯৫৮).pdf/১৩৬

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
গীতিমাল্য
১৩৫

সকল সৌন্দর্যে, সকল আনন্দে, বিশ্বমানবের সকল বিচিত্রতায় উচ্ছ্বসিত হইয়া ছাপাইয়া পড়ে নাই। ‘সেখানে আর ঠাঁই নাহি তো কিছুরই।’ সেই জন্যই ঐ আর-একটি সুর আসিয়া এই নিভৃত বিলাসকে ভাঙিয়া দিল—ঐ বাহির হইয়া পড়িবার সুর।

এমনি করে ঘুরিব দূরে বাহিরে
আর তো গতি নাহি রে মোর নাহি রে।

কেবল এই কবিতাগুলির স্তর যদি চিত্তকে ভরপুর করিয়া রাখিতে পারিত তাহা হইলে কখনোই ঐ বাহির হইয়া পড়িবার সুর এমন প্রবলতা লাভ করিতে পারিত না। কবিতাগুলির সুর বৈষ্ণবধর্মের শ্রেষ্ঠ সুর— রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলাতত্ত্বে এই সুরই তো ফুটিয়াছে। সেই তত্ত্বে এই কথাই বলে যে, ভগবান জীবনকে ভুলাইবার জন্যই সৌন্দর্যের বেশ পরিয়া দেখা দেন, অরূপ হইয়াও রূপ ধরেন, এবং দুঃখের দুর্গম পথের মধ্য দিয়া অভিসারে বিশ্বের অন্তরতম জায়গায় সেই নিভৃত নিকুঞ্জে সকল সংস্কারের পাশ ছিন্ন করিয়া তাহাকে আকর্ষণ করিয়া আনেন—

আমার পরশ পাবে ব’লে
আমায় তুমি নিলে কোলে
কেউ তো জানে না তা।
রইল আকাশ অবাক মানি,
করল কেবল কানাকানি
বনের লতাপাতা।

 কিন্তু সে সুরে কুলাইল না। লোহিত সমুদ্রে এই গান জাগিল—

প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে
মোরে আরো আরো আরো দাও প্রাণ।

আরো আরো আরো চাই। কেবল তৃপ্তির বিরতি চাই না, অতৃপ্তির চিরগতি চাই। কেবল উপলব্ধির শান্তি নয়, নব নব বেদনাময় চৈতন্য।