৩
ইংলণ্ডে, ইংলণ্ড হইতে ফিরিবার পথে জাহাজে, এবং স্বদেশে ফিরিয়া আসিবার পরে ভাদ্র হইতে মাঘ পর্যন্ত ছয় মাসে, কবি যে গীতিমাল্য গাঁথিয়াছেন সে গানগুলি একেবারে স্বচ্ছ, ভারমুক্ত, ফুলেরই মতো নৈসর্গিক সৌন্দর্যে মণ্ডিত। গীতাঞ্জলির কোনো গানই এই গানগুলির মতো এমন মধুর, এমন গভীর, এমন আশ্চর্য সরল নহে।
ইংলণ্ডে ‘জনসংঘাতমদিরা’ স্বভাবতই মানুষকে কিছু-না-কিছু চঞ্চল করিয়া দেয়। তার উপর ইংলণ্ডের গুণীরসিকসমাজের স্তবমদিরা যখন পাত্র ছাপাইয়া উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিয়াছিল তখন সেই শান্তিভঙ্গকারী উত্তেজনা-উন্মত্ততা হইতে আপনাকে নিবৃত্ত রাখিয়া ‘তোমারি নাম বলব’, ‘ভোরের বেলা কখন এসে’ প্রভৃতি সরলমধুর গান রচনা করা আমার কাছে অত্যন্ত বিস্ময়কর বলিয়া মনে হয়। এ-সকল গানের নীচে ‘Cheyne Walk, London’ লেখা না থাকিলে এ গানগুলি ইংলণ্ডে রচিত এ কথা মনে করাই অসম্ভব হইত। ইংলণ্ডে গুণীসমাজ কবির গলায় যে প্রশংসার মণিহার পরাইয়া দিয়াছিলেন সে সম্বন্ধে একটিমাত্র গান গীতিমাল্যে আছে—‘এ মণিহার আমায় নাহি সাজে’।
কবির সৌন্দর্যসাধনা যেমন ‘কড়ি ও কোমল’ ও ‘চিত্রাঙ্গদা’র ভোগপ্রদীপ্ত বর্ণ-উজ্জ্বলতায় প্রথম সূচনা প্রাপ্ত হইয়া ক্রমে ‘সোনার তরী’ ‘চিত্রা’র ‘মানসসুন্দরী’, ‘উর্বশী’ প্রভৃতি কবিতার বর্ণপ্রাচুর্যে ও বিলাসে বিচিত্র হইয়া অবশেষে ক্ষণিকার বর্ণবিরল ভোগবিরত সুগভীর স্বচ্ছতায় পরিণতি লাভ করিয়াছিল, সেই রূপ নৈবেদ্য খেয়া গীতাঞ্জলির ভিতর দিয়া ক্রমশ কবির অধ্যাত্মসাধনা এই গীতমাল্যে বিচিত্রতা হইতে ঐক্যে, বেদনা হইতে মাধুর্যে, বোধপ্রাখর্য হইতে সরল উপলব্ধিতে পরিণত হইয়াছে। উপনিষদে আছে, ‘পাণ্ডিত্যং নির্বিদ্য বাল্যেনানুতিষ্ঠেৎ’—পাণ্ডিত্যকে, অর্থাৎ বেদাধ্যয়নজনিত সংস্কারগত বুদ্ধিকে, দূর করিয়া বাল্যে, অর্থাৎ