বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:কাব্যপরিক্রমা - অজিতকুমার চক্রবর্তী (১৯৫৮).pdf/১৪

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
জীবনদেবতা
১৩

এই নানা বিচিত্র জীবদেহ—সকল উদ্ভিন্ন হইয়া ক্রমে ক্রমে প্রকাশ পাইয়াছে, এবং সে কথা অধুনা সকলেই দেখিতেছি মানেন। আদিম অ্যামিবা (amoeba) এবং জটিল মানবদেহ একই উপাদানে গঠিত, একই জীবকোষ উভয়ের মধ্যেই বিদ্যমান। এই জীবকোষ বা প্রোটোপ্ল্যাজমিক সেল ক্রমেই জটিল হইতে জটিলতর ব্যূহ রচনা করিয়া জীবকে শ্রেষ্ঠ হইতে শ্রেষ্ঠতর শ্রেণীতে উন্নীত করিয়াছে। মানুষের শরীরে, বিশেষভাবে মানুষের মস্তিষ্কে, ইহার জাল যেরূপ ঘন এবং ক্রিয়া যেরূপ দ্রুত ও গতিশীল এমন অন্য জীবদেহে বা জীবমস্তিষ্কে নহে; আর সেইজন্যই মানুষ পৃথিবীর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমান জীব হইয়া উঠিয়াছে।

 ডারুইন, ওয়ালেস প্রভৃতি অভিব্যক্তিবাদের প্রতিষ্ঠাতৃগণের এইসকল সিদ্ধান্ত মানিয়া লইতে কাহারও আপত্তি লক্ষিত হয় না। মানুষ যে বিচিত্র জীবজন্মের মধ্য দিয়া সম্ভাবিত হইয়াছে, এ কথাটা সত্য বলিয়া মানা ভিন্ন গত্যন্তর নাই। সুতরাং ডারুইনের এই মত আশ্রয় করিয়া কেহ যদি বলেন যে ‘আমি এক সময় গাছ ছিলাম’ তবে শুনিতে যতই অদ্ভুত লাগুক, রাগ করা মৃঢ়তা এবং উপহাস করা ততোধিক মূঢ়তা।

 কিন্তু এ কথাটা যে অনেকের অদ্ভুত লাগে তাহার কারণ ইহা নয় যে, বৃক্ষজীবনের মধ্য দিয়া ক্রমে মনুষ্যজীবনের অভিব্যক্তি হইয়াছে এই সিদ্ধান্তটি কোনো মানুষ স্বীকার করিয়া লইয়াছেন। তাহার আসল কারণ এই যে, মানুষ বলিতেছে ‘আমি গাছ হয়ে উঠেছিলুম’— ‘আমি’ উঠেছিলুম এই বোধটা। আরও অধিক কারণ এই যে, সে কথাটা সেই মানুষের আবার ‘অল্প অল্প মনে পড়ে’।

 ‘আমি গাছ হয়ে উঠেছিলুম’ বলিলে বুঝায় যে ‘আমি’র ধারাটা যেন গাছ পর্যন্ত প্রবাহিত, অর্থাৎ গাছের মধ্যেও এই আমি—বোধটা কোনো—না—কোনো আকারে ছিল। অথচ তাহা কেমন করিয়া হয়? আমিবোধটা তো অচেতন বোধ নয়, সংস্কারমাত্র নয়, সে পূর্ণ সচেতন বোধ।