ছিলেন বলিয়া পৃথিবীকে তিনি জড়পিণ্ড মনে করিতেন না। তিনি পৃথিবীকে মানুষের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর প্রাণবান চেতনাবান সত্তা বলিয়া বোধ করিতেন। আমাদের শরীরের মধ্যে কত অসংখ্য জীবাণুর কী প্রচণ্ড আন্দোলন রহিয়াছে, অথচ আমাদের শরীর দেখিয়া তাহা কেন বোধগম্য হয় না? শরীর সেই অসংখ্য বৈচিত্র্যকে সরল করিয়া মিলিত করিয়া লইতে পারিয়াছে, ইহা ব্যতীত আর তো কোনো কারণ নাই। সেইরূপ এই অগণ্য জীবশরীরকে পৃথিবী আপনার বৃহৎ শরীরের অন্তর্গত করিয়া লইয়াছে, তাই সমগ্র পৃথিবীর শরীরে জীবনচাঞ্চল্য কিঞ্চিন্মাত্রও পরিলক্ষিত হয় না। আমাদের হস্তপদের দ্বারা অঙ্গসঞ্চালন আবশ্যক, পৃথিবীর সেরূপ আবশ্যকতা নাই, কারণ তাহার হস্তপদ সর্বত্রই; তাহার লক্ষ লক্ষ চক্ষু এবং কর্ণ, সে আপনার অংশবিশেষের অর্থাৎ মানুষের অসম্পূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অনুকরণ করিতে যাইবে কেন?
ফেক্নারের এই চৈতন্যময় বিশ্বপুরুষের আইডিয়ার সঙ্গে গীতার ‘বিশ্বরূপ’এর এবং উপনিষদীয় ‘সর্বভূতান্তরাত্মা’র ভাবের সম্পূর্ণ মিল পাই। বিশ্ব যে সর্বত্র এক চেতনাবান পুরুষের সত্তা দ্বারা ওতপ্রোত এবং আমরা সকলেই যে তাহার অন্তর্গত, এ কথার আভাস উপনিষদের নানা শ্লোকের মধ্যে আছে। মুণ্ডকোপনিষদে আছে—
অগ্নির্মূর্ধা চক্ষুষী চন্দ্রসূর্যৌ
দিশঃ শ্রোত্রে বাগ্বৃত্তাশ্চ বেদাঃ।
বায়ুঃ প্রাণো হৃদয়ং বিশ্বমস্যপদ্ভ্যাং
পৃথিবীহ্যেষ সর্বভূতান্তরাত্মা।
অর্থাৎ, অগ্নি (দ্যুলোক) ইহার মস্তক, চন্দ্র ও সূর্য চক্ষুদ্বয়, দিক্সকল কর্ণদ্বয়। প্রকাশিত বেদসমূহ বাক্য, বায়ু প্রাণ, হৃদয় বিশ্ব, পাদদ্বয় হইতে পৃথিবী অর্থাৎ মাটি উৎপন্না হইয়াছে— ইনি সমুদয় প্রাণীর অন্তরাত্মা।
এ কেবল কল্পনা মাত্র নহে, ইহাও বিশ্বকে সেইরূপ অখণ্ড চৈতন্যবান