বিভিন্ন শ্রেণীর প্রাণীর জীবকোষের মধ্যেই তার স্বাতন্ত্র্য বা বৈষম্যের কারণ বা বীজ সুপ্ত থাকে। কোথাও আমরা ইহা ধরিতে পারি, কোথাও পারি না।
শুধু জীবতত্ত্ব নয়, মনস্তত্ত্বেও (Psychology) ঠিক এই রকম একটা মতের পরিবর্তন হইয়া গিয়াছে। কণ্ডিল্লাক (Condillac) মনে করিতেন যে আমাদের মনের বিচিত্র ভারসকল এক অখণ্ড আদিম চৈতন্য হইতে ক্রমে ধারাবাহিকরূপে বিকাশ লাভ করিয়াছে। এমন—কি বেইন (Bain) ইহা অস্বীকার করিয়া প্রমাণ করিয়াছেন যে, বুদ্ধি (intellect) ইচ্ছা (will) প্রভৃতির চিহ্ন গোড়াতেই আমাদের চৈতন্যের মধ্যে সূক্ষ্মভাবে লক্ষ্য করা যায়। অঁরি বের্গ্সঁ তো বলেন যে, বুদ্ধি (intellect) ও বোধি (intuition) চৈতন্যের প্রথম অবস্থা হইতেই বিভিন্ন। ক্রমশ সেই ভিন্নতা স্ফুটতর হয় মাত্র। বোধি হইতে কখনও বুদ্ধি বিকাশ লাভ করে না বা বুদ্ধি অভ্যাসগত হইয়া কখনও বোধি হইয়া পড়ে না।
ক্রম—উদ্ভিন্ন বিভিন্ন শ্রেণী (species) ও বিভিন্ন মনোবৃত্তির (faculties) স্বাতন্ত্র্য যদি গোড়াতেই মানিয়া লই, তথাপি জীবনদেবতার মূল কথাটির সহিত তাহার বিশেষ কোনো বিরোধ আমি আশঙ্কা করি না। মানুষের চৈতন্যের বৈচিত্র্যের মধ্যেও যে এক পরম ঐক্য স্পষ্ট বিদ্যমান, ইহা তো কেহই কোনোরূপে অস্বীকার করিতে পারে না। বৈচিত্র্য যতই সূক্ষ্ম হইতে সূক্ষ্মতর হইবে, ঐক্যও ততই ব্যাপক ও গভীরতর হইয়া সেই— সমস্ত জটিল সূহ্মাতিসূক্ষ্ম বৈচিত্র্যকে এক চরম সমাধানের মধ্যে সার্থক করিবে।
এক অনন্ত বিশ্বচৈতন্যই জড়ে উদ্ভিদে ও জীবে আত্মপ্রকাশ করিতেছেন। অভিব্যক্তির ফলে মানবাত্মা যতই এই বিশ্বাত্মা বা বিশ্বচৈতন্তের দিকে অগ্রসর হইতেছে ততই তার উপলব্ধির বৈচিত্র্য বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইতেছে। রবীন্দ্রনাথের কবি—উপলব্ধি যে ক্রমে এই বিশ্ব—ব্যাপকতা লাভ করিয়া ফেক্নার—কথিত বিশ্বচৈতন্যের সহিত একটা প্রাণময় যোগ স্থাপন করিতে পারিয়াছে, তাহা আর অস্বীকার করিবার উপায় কী? বহুবিধ ব্যক্তিত্বের (multiple personality) বিচিত্র সমাবেশও এই কারণেই তাঁহার একব্যক্তিত্বের ভিতর দিয়া যে প্রকাশমান হইয়া উঠিয়াছে, ইহা তাঁহাকে মানিতেই হয়। সুতরাং জীবনদেবতার এই মূলতত্ত্বটির সঙ্গে বর্তমান জীবতত্ত্ব বা মনস্তত্ত্বের সিদ্ধান্তের কোথাও কোনো বিরোধ নাই।