জীবনকে পায়রার বাসার মতো খোপে খোপে ভাগ করিয়া রাখা সম্ভব নয়। জীবন যে একবস্তু; তাহার মধ্যে এত ভাগ এত ভেদ কেমন করিয়া করা যায়? সুতরাং ভিন্ন ভিন্ন সাধনার ভেদগুলিকে অস্বীকার করিয়া নয়, বরং পুরামাত্রায় মানিয়া লইয়াই দেখিতে হইবে, সে—সমস্ত ভেদের মধ্যে অভেদ কোথায়, ঐক্যতত্ত্বটি কোনখানে? সেই ঐক্যতত্ত্বটি যেমনি বাহির হইবে অমনি তাহার রসও আর্টের ভিতর দিয়া প্রকাশ লাভ করিবে।
‘রাজা’ নাটকের নাট্যবস্তু এই রূপের সাধনা এবং অধ্যাত্মসাধনার ভেদ লইয়া, এবং এই ভেদজনিত সংঘাতের উপরেই এই নাটকের পত্তন। সুতরাং এ নাটকে যে—সকল রস ফুটিয়াছে তাহা একেবারে নূতন। এ—সকল রস যেমন নূতন, যে—সকল চরিত্রকে আশ্রয় করিয়া এই রসগুলি ফুটিয়াছে তাহাও নূতন। নাটকের প্রধান নায়িকা সুদর্শনা। রূপের সাধনার যে স্বরূপ বর্ণনা করিলাম তাহাই তাহার চরিত্রকে আশ্রয় করিয়া ফুটিয়াছে। নাটকের প্রধান পাত্র ঠাকুরদাদা। অধ্যাত্মসাধনার যে স্বরূপ বর্ণনা করিলাম তাহাই সেই চরিত্রকে আশ্রয় করিয়া প্রকাশ পাইয়াছে। আর, প্রধান অথচ অদৃশ্য নায়ক স্বয়ং রাজা তাঁহার সম্বন্ধে পরে কথা হইবে।
নাটকের গল্পটি একটি বৌদ্ধজাতক হইতে লওয়া হইয়াছে। মূল গল্পটি নাট্যে ঈষৎ পরিবর্তিত হইয়া যাহা দাঁড়াইয়াছে তাহা এই:
এক কুরূপ বা অরূপ রাজা—মানব হিসাবে ধরিলে কুরূপ, ঈশ্বরের হিসাবে ধরিলে অরূপ—তাঁহার ‘সুদর্শনা’ রানীকে এক অন্ধকার ঘরে আনাইয়া সেইখানে প্রত্যহ তাঁহার সহিত মিলিত হইতেন। তাঁহার প্রতি পরমভক্তিমতী তাঁহার এক দাসী ছিল, তাহার নাম সুরঙ্গমা; সে যৌবনে নষ্ট হইবার পথে গিয়াছিল, তার পর রাজার আশ্রয়ে আসিয়া সে রক্ষা পায়, রাজা তাহাকে সেই অন্ধকার ঘরের দাসী করিয়া দেন। রানীর মধ্যে রূপের তৃষ্ণা প্রবল, রাজাকে চক্ষে দেখিতে না পাইয়া রানীর মন অধীর হইয়া উঠিয়াছে। দাসী সুরঙ্গমার মতো অন্ধকার ঘরে রাজাকে ধ্যান