বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:কাব্যপরিক্রমা - অজিতকুমার চক্রবর্তী (১৯৫৮).pdf/৪২

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
রাজা
৪১

তোমার দাসের অধম দাসকেও তোমার চেয়ে চোখে সুন্দর ঠেকে। তোমাকে তেমন করে দেখবার তৃষ্ণা আমার একেবারে ঘুচে গেছে— তুমি সুন্দর নও প্রভু, সুন্দর নও, তুমি অনুপম।’

 রাজা বলিলেন, ‘তোমারই মধ্যে আমার উপমা আছে।’

 সুদর্শনা বলিল, ‘যদি থাকে তো সেও অনুপম। আমার মধ্যে তোমার প্রেম আছে, সেই প্রেমেই তোমার ছায়া পড়ে; সেইখানেই তুমি আপনার রূপ আপনি দেখতে পাও—সে আমার কিছুই নয়, সে তোমার।’

 তখন রাজা তাহাকে বলিলেন, ‘অন্ধকারের লীলা এবার শেষ হল। এখন বাইরে চলে এসো, আলোয়।’

 নাটকের এইখানে সমাপ্তি।

 আমি বলিয়াছি, রূপের সাধনা ও অধ্যাত্মসাধনার দ্বন্দ্বের উপরেই এই নাটকের ভিত্তি। সুদর্শনার ভিতর দিয়াই সেই দ্বন্দ্বের লীলা এ নাটকে আমরা দেখিতেছি। তাহার রূপের জন্য প্রবল তৃষ্ণা। প্রথম অবস্থায় সেই তৃষ্ণা তাহাকে অশুচি অসতী করিল, তাহার প্রমোদ—উদ্যানে আগুন লাগাইয়া দিল, তাহাকে প্রতিষ্ঠাচ্যুত করিয়া সাত রিপুর টানাটানি—হানাহানির মাঝখানে ফেলিয়া দিল, তাহার ভিতরে প্রবল আত্মাভিমান জাগাইল। দ্বিতীয় অবস্থায় অপমান এবং আঘাতের ভিতর দিয়া বাহ্যরূপের কামনা ক্রমে ক্রমে মরিয়া গিয়া ‘সবরূপ—ডোবানো রূপ’, অপরূপ রূপ, রানীর মনটিকে ক্রমশ অধিকার করিয়া তাহাকে মধুর করিল এবং পরিপূর্ণ আত্মদানে যখন তাহার আত্মাভিমানও নিঃশেষে বিলুপ্ত হইল তখনই রাজার সঙ্গে তাহার যথার্থ মিলন ঘটিল। সুদর্শনার পরিণতির ক্রমকে তিন ভাগে ভাগ করা যাইতে পারে। আদিতে, সৌন্দর্য উপভোগের জন্য সুতীব্র আকাঙ্ক্ষা; মধ্যে, সেই আকাঙ্ক্ষাকে পরিতৃপ্ত করিতে গিয়া নৈতিক অবনতি, লালসার অগ্নিকাণ্ড, প্রবৃত্তির বিদ্রোহ, শেষে, দ্বন্দ্বাবসানে মাধুর্যে আত্মদান এবং আত্মাভিমানে জলাঞ্জলি, ঐশ্বর্যের বদলে দৈন্যকে স্বীকার