বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:কাব্যপরিক্রমা - অজিতকুমার চক্রবর্তী (১৯৫৮).pdf/৪৬

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
রাজা
৪৫

পারেন নাই। আবার রানী রাজার অন্য স্বরূপ কোনোদিনই বুঝিতেন না, যদি রানীকেও পথে বাহির হইতে না হইত। এইরূপে অধ্যাত্মসাধনার প্রয়োজন ছিল রূপের সাধনাকে; রূপের সাধনার প্রয়োজন ছিল অধ্যাত্মসাধনাকে। যে ঠাকুরদাদা বিশ্বের মধ্যে আপনাকে বিলাইয়া দিয়াছেন তিনি জানেন নাই যে, ত্যাগের শেষেও একটি ভোগ আসে, একবার আপনার আধারে বিশ্বকে নিবিড় করিয়া পাওয়া দরকার। সেই আধার রূপের আধার। পক্ষান্তরে, যে রানী বিশ্বকে কেবলই বিশেষ রূপ দিয়া সেই আধারেই ভোগ করিয়াছে সে জানে নাই যে, সর্বস্বত্যাগ ভিন্ন ভোগের পূর্ণতা নাই, আপনাকে বিশ্বের মধ্যে নিঃশেষে বিলাইয়া চুকাইয়া দিলে তবেই ভোগের পূর্ণতা।

 কেবল রাজার স্বরূপের মধ্যে একটি দিক পাই না। এ রাজা দুঃখময় ভগবান নন, suffering God নন। জীবাত্মা রানীর মুখ দিয়া রাজাকে যখন জিজ্ঞাসা করিল, ‘তুমি আমাকে কেমন ক’রে দেখতে পাও? কী দেখ?’ রাজা উত্তর করিতেছেন যে, তিনি মানুষকে বিশ্ব—অভিব্যক্তির চরমতম পূর্ণতম রূপ করিয়া দেখিতেছেন। কী আশ্চর্য, কী চমৎকার সেই জায়গাটি! রাজা বলিতেছেন, ‘দেখতে পাই যেন অনন্ত আকাশের অন্ধকার আমার আনন্দের টানে ঘুরতে ঘুরতে কত নক্ষত্রের আলো টেনে নিয়ে এসে একটি জায়গায় রূপ ধরে দাড়িয়েছে। তার মধ্যে কত যুগের ধ্যান, কত আকাশের আবেগ, কত ঋতুর উপহার।’ মানুষের এই সীমাবদ্ধ এতটুকখানি রূপের মধ্যে সমস্ত বিশ্বের রূপ, সমস্ত চন্দ্রসূর্যতারার রূপ যে ভরিয়া আছে এবং অরূপ ভগবান যে সেই রূপে মুগ্ধ, এমন কথা এমন আশ্চর্য ভাষায় পৃথিবীর আর কোন্ মহাকবি বলিয়াছেন আমি জানি না।

 অথচ দেখি, সেই রাজা সুদর্শনার পতনের পর একেবারে নিশ্চল, নির্বিকল্প, নির্বিকার। যে সুদর্শনা তাঁহার হৃদয়ে তাঁহার দ্বিতীয়, সে তো দূর নয়, সে তো অন্য নয়। তাহার পাপভোগে কি তাঁহার কোনো ভোগ