নাই, তাহার কোনো যন্ত্রণা নাই? রবীন্দ্রনাথের রাজা তো স্বতন্ত্র নির্লিপ্ত সুদূর ভগবান নন। অবশ্য রাজা সে সময়ে গোপনে সুদর্শনার বাতায়নের নীচে প্রেমের বীণা বাজাইয়া সুদর্শনার ভিতর হইতে তাহার মন গলাইবার চেষ্টা করিলেন এবং সাত রিপু বা সাত রাজার টানাটানির অপমান হইতে তাহাকে উদ্ধার করিলেন। কিন্তু জীবের মুক্তির জন্য কোথায় তাঁহার বেদনা, তাঁহার ব্যাকুলতা?
আমার মনে হয়, এক পক্ষে রাজার প্রেম এমনি নির্বিকার নিরুদ্বিগ্ন প্রেম বলিয়া অন্য পক্ষে সুদর্শনার প্রেমও প্রথম অবস্থায় প্রবৃত্তির অপেক্ষাকৃত নীচের স্তর ছাড়াইয়া খুব বেশি উঁচুতে উঠিতে পারে নাই। অভিমানের আগুনে যখন গলিল তখনও কোথায় সুদর্শনার প্রেমের গভীর শান্তি, রহস্যগম্ভীরতা, নিবিড় পরিপূর্ণতা, আত্মবিহ্বল রসপ্লাবন? নাটকের শেষের ভাগে এগুলির আভাস আছে বটে, কিন্তু আরও একটু পূর্ণতর স্ফুটতর প্রকাশ হইলে সুদর্শনার অধ্যাত্মপ্রেমের মাধুর্যপরিপ্লুত ভক্তিবিনম্র রূপটি আরও উজ্জ্বল হইয়া দেখা দিত।
সুদর্শনার পাশাপাশি রাজার দাসী সুরঙ্গমার চিত্রটি কী আশ্চর্য! ঠিক একটি ভক্ত সাধকের চিত্র। তাহার চরিত্রে কোনো জটিলতা নাই। একসময়ে সে পাপের পথে গিয়া ঘা খাইয়া ধর্মের পথে ফিরিয়াছে, তার পর ঐকান্তিক নিষ্ঠাতেই তাহার সমস্ত চরিত্র স্থিতি পাইয়াছে। সে বলিতেছে, রাজার ‘কী অবিচলিত নিষ্ঠুরতা!’ অথচ বলিতেছে, ‘এত অটল এত কঠোর ব’লেই এত নির্ভর, এত ভরসা।’ ক্রমে সেই নিষ্ঠার ভিতর দিয়া সে এক সময়ে অন্ধকার ছাড়িয়া আলোতেই আসিল। অর্থাৎ, আপনার ভিতরকার সাধনার নিভৃত বেষ্টনটি ছাড়াইয়া সমস্ত সংসারের ভিড়ের মধ্যেই আসিল। সুদর্শনা যখন রাজার উপর রাগ করিয়া দূরে চলিল তখন সে বলিল, ‘আমি তোমার সঙ্গে যাব।’ সুদর্শনা তাহাকে বলিল, ‘না, তোকে আমি নিতে পারব না— তোর কাছে থাকলে আমার বড়ো গ্লানি