বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:কাব্যপরিক্রমা - অজিতকুমার চক্রবর্তী (১৯৫৮).pdf/৫৭

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
৫৬
কাব্যপরিক্রমা

মনে সুস্পষ্ট, কিন্তু অনন্তের জন্য পিপাসা যে রসকে জাগায় তাহার ধারণা তো তেমন স্পষ্ট হইবার নহে। কারণ, সেই বিশেষ অনুভূতিটাই কোনো নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ধরা দেয় না, সেই কারণে তাহাকে ভাষায় প্রকাশ করা আরও কঠিন হইয়া বসে। তখন symbol অথবা বিগ্রহকে আশ্রয় করিতে হয়, অর্থাৎ ইঙ্গিতে ইশারায় সেই রসের খানিকটা আভাস দিতে হয়।

 ‘সোনার তরী’ মানেই কোনো বিশেষ রূপ নয়, কিন্তু অপরূপ। কালিদাস বলিয়াছেন যে, ‘রম্যাণি বীক্ষ্য মধুরাংশ্চ নিশম্য শব্দান্’, রম্য দৃশ্য দেখিয়া এবং মধুরধ্বনি শ্রবণ করিয়া, মন যখন পর্যুৎসুক হয় তখন ‘জননান্তরসৌহৃদানি’, জন্মজন্মান্তরের ভালোবাসার কথা মনে পড়ে। এই যে একটি রস ইহাকে কী নাম দিব? উপলক্ষটা হয়তো কোনো বিশেষ রূপ বা বিশেষ ধ্বনি, কিন্তু তাহাকে ছাড়াইয়া মন যে উতলা হয় সে এমন একটি অপরূপ সুদূরের জন্য, যাহার কোনো নাম নাই, রূপ নাই। বর্ষার ভরা নদী হয়তো ‘সোনার তরী’র উপলক্ষ, কিন্তু সে যে বিরহকে জাগায় তাহা আর তাহাকে আশ্রয় করিয়া তো থাকে না।

 কিন্তু কেনই বা সিম্‌বল্ লইয়া এত বকাবকি করিতেছি? আমাদের দেশে এটা তো অপরিচিত জিনিস নহে। হিন্দুর ধর্মকর্ম, আচার—অনুষ্ঠান, শিল্প, সমস্তই ভাবের বিগ্রহে আগাগোড়া মণ্ডিত। হিন্দু তো এ কথা বলে না যে, ভাবকে কোনোদিন কেহ জানিয়া, ব্যবহার করিয়া, বলিয়া শেষ করিয়া দিতে পারে। সেইজন্যই তো সে চিহ্ন মানে, বিগ্রহ মানে— সে জানে যে, ভাব অসংখ্যরূপে আপনাকে ক্রমাগত লীলায়িত করিয়া প্রকাশ করিয়া থাকে এবং সেই—সমস্ত রূপরূপান্তরকে অনন্তগুণে অতিক্রম করিয়াও বিরাজ করে। হিন্দুর চিত্ত কেন না বলিবে যে, ‘সোনার তরী’ বল, ‘চিঠি’ বল, ‘পরশপাথর’ বল, ‘রাজা’ বল, ও সমস্তই ছল— অনন্ত সৌন্দর্যের বোধকে একটি মূর্তির মধ্যে ক্ষণকালের মতো বাঁধিবার আয়োজন; ও যে ছল এইটুকু উহাকে দিয়া বলানোই উহার চরম সার্থকতা।