আসল কথা, অনন্তের রসবোধ যখন সাহিত্যের দরবারে আসিয়া রূপ প্রার্থনা করে তখন সাহিত্যস্রষ্টাকে বিপদে পড়িতে হয়। তাহাকে পণ করিতে হয় কী করিয়া রূপ দিয়া ও রূপ না দেওয়া যায়। কারণ, রূপ যে সীমাবদ্ধ, সে এমন ভাবকে কী করিয়া প্রকাশ করিবে যাহা সীমায় ধরা দিবে না? তখন তাহার একমাত্র সম্বল হয় উপমা বা রূপক। উপমা খানিকটা বাঁধে, খানিকটা আলগা রাখে। সে বাঁধন এতই সুকুমার যে তাহার আবরণ সরাইয়া ভাবকে দেখা কিছুমাত্র কঠিন হয় না।
আশা করি, আমি কেন পূর্ব পূর্ব কোনো কবিতা এবং আধুনিক নাটকগুলির মধ্যে সাদৃশ্য কল্পনা করিয়াছি তাহা পাঠকের নিকটে স্পষ্ট হইয়াছে। আমি বলিতে চাই এই যে, রবীন্দ্রনাথের মধ্যে রূপের ভিতরে অপরূপকে দেখিবার জন্য একটা বেদনা আছে বলিয়াই তাঁহাকে অপরূপের ভাবটিকে এমন করিয়া প্রকাশ করিতে হইয়াছে যাহাতে সে নির্দিষ্ট না হইয়া উঠে। অর্থাৎ, তাহাকে সিম্বল্ আশ্রয় করিতে হইয়াছে।
সিম্বল্ লইয়া এত ব্যাখ্যাবাহুল্য করিবার আর—একটু কারণ আছে। সিম্বলে্র ঠিক অর্থটি হৃদয়ঙ্গম না করিয়া অনেকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করিয়া বসেন, তবে ‘সোনার তরী’টা কী, তাহার উদ্দিষ্ট মানুষটি কে? সোনার ধানটা কী? অমল কি তবে মানবাত্মা? চিঠি মানে কি মুক্তি? অর্থাৎ, তাঁহারা সমস্ত একেবারে সুনির্দিষ্ট করিয়া লইতে চান। আধ্যাত্মিক সতাকে এই—সকল লোকই বৈজ্ঞানিক সত্যের মতো পরিষ্কার না দেখিতে পারিলে অধীর হইয়া উঠেন এবং ধর্মকে কল্পনা বলিয়া উপহাস করিতে উদ্যত হন। ইঁহারা একটা কথা মনে রাখেন না যে বুদ্ধির উপরেও মানুষের একটা intuition, একটা সহজ প্রত্যয় আছে; বুদ্ধি যেখানে নাগাল পায় না সেই খানে তাহার শরণাপন্ন হইতে হয়।