২
‘ডাকঘর’কে সিম্বলিক্যাল অর্থাৎ বিগ্রহরূপী নাট্য নামকরণ করা গেল। এটা ঠিক নাম নয়, কিন্তু নির্দেশমাত্র। এখন দ্বিতীয় কথা এই যে, ইহা নাটিকা বটে, অথচ ইহার মধ্যে নাটকত্ব কিছুই নাই, ঘটনাও বড়ো নাই। তবে ইহাকে ‘সোনার তরী’ গোছের কবিতার মতো করিয়া লিখিলেই হইত, নাটিকা বলিয়। আড়ম্বর করিবার কী প্রয়োজন ছিল?
একটি রুগ্ন বালকের সৌন্দর্যমুগ্ধ কল্পনাপীড়িত চিত্ত বিশ্বের মধ্যে বাহির হইয়া পড়িবার জন্য ব্যাকুল, শুধু এই ভাবটুকু যদি থাকিত তবে তাহা গীতে ব্যক্ত করা যাইত সন্দেহ নাই। কিন্তু অমলের সঙ্গে সঙ্গে মাধবদত্ত, ঠাকুরদা, মোড়ল, সুধা প্রভৃতি যে মানুষগুলিকে উপস্থিত করা হইয়াছে তাহাদের মধ্যে যে নানা বৈচিত্র্য আছে। কেহ—বা অনুকূল, কেহ—বা প্রতিকূল। সুতরাং ঐ মূলভাবটুকুকে সূত্রের মতো করিয়া এই—সকল বৈচিত্র্যকে তাহার সহিত সম্মিলিত করিয়া একটি স্ফাটিক ব্যূহ রচনা করিতে হইয়াছে। এই বিচিত্রতার সমাবেশেই তো নাট্যরস। শুধু একটিমাত্র ভাবের রস হইলে গীতিকবিতার রূপ গ্রহণ করা উচিত ছিল। সুতরাং এ নাটিকার শেষ পর্যন্ত না পড়িলে পুরা রসাস্বাদন হয় না, ইহা মাঝখানে পড়িয়া থামিবার জো নাই।
ঘটনার পর ঘটনা সাজাইলেই কি সব সময়ে ঔৎসুক্য বেশি করিয়া জাগে? আমার তো মনে হয়, ভিতরের চিন্তা, কল্পনা ও অনুভূতির একটা ক্রমবিকাশের গতিবেগ, বাহিরের ঘটনাপুঞ্জের গতিবেগের চেয়ে অনেক বেশি প্রবল। যেমন ধরো ‘গোরা’ উপন্যাসটি। তাহার উপাখ্যান—অংশটুকু এক নিশ্বাসে শেষ করা যায়। কিন্তু মানবহৃদয়ের কী বেগবান প্রচণ্ড ঘাত—প্রতিঘাত ঐ উপন্যাসে তরঙ্গিত হইয়া চলিয়াছে— অধ্যায়ে অধ্যায়ে, এমন—কি ছত্রে ছত্রে, যে ঔৎসুক্য খাড়া হইয়া জাগিয়া থাকে এমন কোন্ ঘটনাবহুল উপন্যাসে থাকে আমি তো জানি না।