আছে। তাই তো সে এমন রমণীয়। তাই তাহার ফিরির সুরটিকে বিশ্ববাঁশির মতো সকরুণ করিয়া দিয়াছে। বিচ্ছিন্ন করিয়া দেখিলে তাহার কোনো মাহাত্ম্যই নাই।
তেমনি ঐ-যে সম্মুখের পথটি, তাহারও রহস্য ঐখানে—সে যে বহু দূরের যাত্রীকে ক্ষণিকের মতো, চকিতের মতো, একবার ঐ একটি জায়গায় দাঁড় করাইয়া দেখাইতেছে; বলিতেছে, অনন্ত প্রবাহের একটিমাত্র পরিপূর্ণ মুহূর্তের ছবিখানি দেখো! অনন্ত সমুদ্রকে একটিমাত্র তরঙ্গের মধ্যে দেখো! ইহার পশ্চাতে অনন্ত সমুদ্র, ইহার সম্মুখে অনন্ত সমুদ্র, সেই-সমস্ত প্রবাহ যেন এই একটি তরঙ্গে থমকিয়া দাঁড়াইয়াছে।
তার মানে কী? তার মানে এই যে, আমরা এখানে যাহা-কিছু দেখিতেছি বা পাইতেছি তাহা ক্রমাগতই চলিবার মুখে, সরিবার মুখে। আমরা তাহার আদিও জানি না, তাহার অন্তও জানি না, জানি শুধু তাহার মাঝখানের খণ্ড একটুখানি কালের কথা। সেই খণ্ডকালে যেটুকু যাহা দেখিতেছি তাহাকেই বাস্তব বলিয়া, সত্য বলিয়া যে আমরা চাপিয়া ধরি, তাহাতেই তাহাকে হারাই, তাহার যথার্থ সত্তাকে পাই না। যদি সেই খণ্ডকালের খণ্ড জিনিসের উপর তাহার অনাদি অতীত এবং অনন্ত ভবিষ্যতের একটি আলো ফেলিয়া সে খণ্ডের মধ্যে একটি অখণ্ডের পরিচয় পাই, তবেই সেই জিনিস আশ্চর্য অপরূপ বলিয়া প্রতিভাত হইবে। তাহা তখন এক দিকে ব্যক্ত, অন্য দিকে অব্যক্ত; এক দিকে সসীম, অন্য দিকে অসীম; এক দিকে রূপ, অন্য দিকে অপরূপ। তখন সে কী বিস্ময়, কে তাহা বর্ণনা করিবে?
এ তত্ত্বের কথা নয়, কিন্তু দৃষ্টির কথা। এই দৃষ্টি লইয়াই কবি রবীন্দ্রনাথ পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। বুদ্ধি যে মানুষের শেষ সম্বল নয়, তাহার সঙ্গে যে কেবল বহির্বিষয়মাত্রের যোগ, মানুষের অধ্যাত্মপ্রকৃতির গভীরতা পরিমাপ করিতে বুদ্ধি যে অক্ষম, এ-সকল কথা আধুনিক যুগে ইউরোপের