জীবনস্মৃতি
ভালো আত্মজীবনীর বিশেষত্বই এই যে, তাহা জীবনকে কেবল বাহিরের কতকগুলি ঘটনার জড়সমষ্টির মধ্যে শৃঙ্খলিত কয়েদীর মতো করিয়া দেখায় না। তাহা জীবনের অন্তরতম স্থানের একটি গভীর অভিপ্রায়ের সূত্রে বাহিরের ঘটনাগুলিকে এমনি মালার মতন গাঁথিয়া তোলে যে, জীবনের সকল বৈচিত্র্যেরই একটি বড়ো তাৎপর্য দীপ্যমান হইয়া উঠে। জীবন যে বাহির হইতে কেবলই নিয়ন্ত্রিত নয়, কিন্তু ভিতর হইতে উচ্ছ্বসিত, সে যে বদ্ধ নয়, কিন্তু মুক্ত—এ কথা আমরা তখন সহজেই বুঝিতে পারি।
কিন্তু এমন করিয়া আপনাকে উদ্ঘাটিত করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। কারণ, নিজের কথা বলিতে গেলেই মানুষ অতিসচেতন হইয়া পড়ে—তখন তাহার কথার মধ্যে স্বচ্ছতা থাকে না, দেখিতে দেখিতে মিথ্যা ও ভান আসিয়া দেখা দেয়। আপনাকে না ভুলিতে পারিলে, আপনাকে অন্য লোকের মতো করিয়া স্বতন্ত্র করিয়া না দেখিতে পারিলে, আত্মজীবনী লিখিতে পারা যায়, ইহা আমার বিশ্বাস নহে। কিন্তু সেই আপনাকে আপনা হইতে স্বতন্ত্র করা সকলের চেয়ে কঠিন-সাধনা-সাপেক্ষ। এই জন্য সাহিত্যে যথার্থ আত্মজীবনী লেখা সকলের চেয়ে শক্ত ব্যাপার। এখানে পদে পদে অহমিকা ও আত্মপ্রতারণার সম্ভাবনা আছে বলিয়াই ইহা এত দুরূহ।
ইউরোপে বহুদিন হইতে অনেকে এই কার্য করিয়া আসিতেছেন। সেইজন্য দেখা যায় যে, মানুষ সেখানে আপনাকে অনেকটা পরিমাণে উদ্ঘাটিত করিয়া দেখাইতে অভ্যস্ত হইয়াছে। সেণ্ট অগস্টিনের কন্ফেশন্সে যে-সকল পাপের কাহিনী বিবৃত হইয়াছে তাহা আমাদের দেশের কোনো সাধু মহাত্মা অমন অসংকোচে বলিতে পারিতেন কি না সন্দেহ। কবি গ্যয়্টে তাঁহার আত্মজীবনী যেভাবে লিখিয়াছেন তাহা